📌 প্রথম আলো কলাম, লেখক নাদিম মাহমুদ (গবেষক, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়)। রাকসু জিএস সালাউদ্দিন আম্মারের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড: ছাত্রলীগ ট্যাগ দিয়ে মারধর, প্রক্টর অফিসে হাঙ্গামা, রেজিস্ট্রারকে হুমকি, ৬ ডিনের পদত্যাগ, তালা ঝুলানো, পিএম ব্যানার ছেঁড়া। গঠনতন্ত্র: সৌহার্দ্য, সহযোগিতা, দক্ষতা উন্নয়ন। ঘটনা ২৭-২৮ জুলাই: আনাস, হাসিব, মাহমুদুল হাসন, মহসিন আলম। নেতৃত্বগুণ ও মাস্তানির পার্থক্য।
বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রসংসদ কিংবা ছাত্রদের ইউনিয়ন রয়েছে। এসব সংগঠন মূলত অরাজনৈতিক—একই সঙ্গে তারা শিক্ষার্থীদের ন্যায্য অধিকার ও শিক্ষার পরিবেশ উন্নয়ন নিয়ে কাজ করে। কিন্তু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু)-এর বর্তমান নেতারা একের পর এক বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে মূল দায়িত্ব ভুলে গেছেন—লেখক ও গবেষক নাদিম মাহমুদ তাঁর এই কলামে প্রশ্ন তুলেছেন। রাকসুর জিএস সালাউদ্দিন আম্মারের বিরুদ্ধে অভিযোগ—ছাত্রলীগ ট্যাগ দিয়ে শিক্ষার্থীদের মারধর, প্রক্টর অফিসে হাঙ্গামা, ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রারকে হুমকি, ডিনদের পদত্যাগে বাধ্য করা, প্রধানমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা জানানো ব্যানার ছেঁড়া। লেখক প্রশ্ন করেছেন—'রাকসুর জিএসের কাজ কী?'
🔴 মূল পয়েন্ট
- লেখক: নাদিম মাহমুদ—গবেষক, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়; কলাম, প্রথম আলো, ২৮ জুলাই ২০২৬।
- রাকসু জিএস: সালাউদ্দিন আম্মার—বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে বছরজুড়ে শিরোনামে।
- গঠনতন্ত্র: রাকসুর কাজ—সৌহার্দ্যপূর্ণ ক্যাম্পাস-জীবন, পারস্পরিক সহযোগিতা, বক্তৃতা-লেখালেখি-বিতর্ক দক্ষতা উন্নয়ন।
- ঘটনা (২৭-২৮ জুলাই): প্রেমঘটিত বিষয়ে প্রক্টর অফিসে বৈঠক—আনাস ও হাসিব (ইতিহাস বিভাগ), মাহমুদুল হাসন (সংস্কৃত); আম্মার আনাসকে ছাত্রলীগ কর্মী দাবি করে মারধর; পরে লাইব্রেরিতে মারপিট; অ্যাম্বুলেন্স থেকে টেনে পেটানো।
- পূর্ববর্তী ঘটনা: ১০ নভেম্বর ২০২৫—ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রারকে হুমকি; ২১ ডিসেম্বর ২০২৫—৬ অনুষদের ডিনদের পদত্যাগে বাধ্য, তালা ঝুলানো; ১৮ জানুয়ারি ২০২৫—প্রধানমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা ব্যানার ছেঁড়া।
- প্রশ্ন: ছাত্রলীগ ট্যাগ দেওয়ার দায়িত্ব কে দিয়েছে? মুঠোফোন তল্লাশির ক্ষমতা কোথায়? প্রক্টরিয়াল বডির আইন অনুযায়ী শাস্তি হওয়ার কথা নয় কি?
- তুলনা: যাঁদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করা হয়েছিল—তাঁদের একই কাজ করলে ঘৃণিত হবেন; নেতৃত্বগুণ ও মাস্তানির পার্থক্য।
রাকসুর গঠনতন্ত্র ও মূল দায়িত্ব
বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রসংসদ কিংবা ছাত্রদের ইউনিয়ন রয়েছে। এসব সংগঠন মূলত অরাজনৈতিক—একই সঙ্গে তারা শিক্ষার্থীদের ন্যায্য অধিকার ও শিক্ষার পরিবেশ উন্নয়ন নিয়ে কাজ করে। শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল ও মানবিক গুণাবলির বিকাশের জন্য ছাত্রসংসদগুলো নানা ধরনের ক্যারিয়ার উন্নয়ন ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড করে থাকে। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্রসংসদগুলোর জন্ম হয়েছে মূলত এসব মূলনীতি ঘিরেই।
রাকসুর গঠনতন্ত্রে বলা আছে—১. শিক্ষার্থীদের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ ক্যাম্পাস-জীবন গড়ে তোলা, যাতে তাঁদের দূরদর্শী সক্রিয় নেতৃত্ব সমাজ ও জাতির জন্য প্রস্তুত হয়; ২. বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে এবং বাংলাদেশ ও বিদেশের অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পারস্পরিক সহযোগিতা, বোঝাপড়া ও সৌহার্দ্যবোধ গড়ে তোলা; এবং ৩. শিক্ষার্থীদের মধ্যে বক্তৃতা, লেখালেখি, বিতর্ক ইত্যাদি দক্ষতা উন্নয়নের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করা।
'রাকসুর জিএসের কাজ কী?'
শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষের বাইরে কো-কারিকুলাম কর্মকাণ্ডে সহায়তা করা যে সংগঠনটির মূল দায়িত্ব—সেই সংগঠনটির নেতারা একের পর এক বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে তাঁদের মূল দায়িত্বের কথা একবারে ভুলে গেছেন। বছরজুড়েই পত্রিকার শিরোনামে আলোচনায় থাকছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নেতারা। এখনকার নেতারা কখনো পত্রিকা অফিসে আগুন লাগানোর উসকানি দিচ্ছেন, কখনো ছাত্রলীগ ট্যাগ দিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীকে পেটানো হচ্ছে, কখনো বা শিক্ষকদের নাজেহাল করার খবর গণমাধ্যমে এসেছে।
নাদিম মাহমুদ প্রশ্ন করেছেন—'রাকসুর জিএসের কাজ কী? তাঁর দপ্তরে কি ভুক্তভোগী ওই নারী শিক্ষার্থী কোনো অভিযোগ দিয়ে সমাধান চেয়েছিলেন? যদি না চান—তিনি কেন প্রক্টর অফিসে গিয়ে হাঙ্গামা করলেন? নিষিদ্ধ থাকা ছাত্রলীগ তালাশের দায়িত্বই বা তাঁকে কে দিয়েছে? পুলিশ নাকি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন? একজন স্বাধীন নাগরিকের মুঠোফোন তল্লাশির দায়িত্ব এই নেতাকে কে দিয়েছে?'
২৭-২৮ জুলাই ঘটনা ও পূর্ববর্তী ইতিহাস
২৭-২৮ জুলাই প্রথম আলোর অনলাইনে প্রকাশিত খবর বলছে—প্রেমঘটিত বিষয়ের সমাধানের জন্য অভিযুক্তদের নিয়ে রোববার রাতে নিজ কার্যালয়ে বৈঠকে বসেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর। অভিযুক্ত শিক্ষার্থী মহসিন আলমের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী আনাস, হাসিব, সংস্কৃত বিভাগের মাহমুদুল হাসন। একপর্যায়ে তাঁদের সঙ্গে প্রক্টরের বাগ্বিতণ্ডা হয়। পরদিন সোমবার দুপুরে আবার বৈঠক বসলে সেখানে রাকসুর জিএস সালাউদ্দিন আম্মারসহ কয়েকজন নেতা আনাসকে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কর্মী বলে দাবি করেন। এ সময় তাঁর মুঠোফোনে ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতার সঙ্গে তোলা ছবি দেখিয়ে মারধর করা হয়।
গত বছর ১০ নভেম্বর আমরা পত্রিকায় দেখলাম—এই নেতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রারকে হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন, নিজেকে রাকসুর নির্বাচিত জিএস বলে দাম্ভিকতা দেখান। এর পরের মাসে বিশ্ববিদ্যালয়টির ছয়টি অনুষদের আওয়ামী লীগপন্থী ডিনদের জন্য নিজে পদত্যাগপত্র তৈরি করেন রাকসুর সাধারণ সম্পাদক। প্রশাসন ভবনের উপাচার্য, সহ-উপাচার্য, প্রক্টর, রেজিস্ট্রারসহ সব দপ্তরের কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে শেষ পর্যন্ত শিক্ষকদের পদত্যাগে বাধ্য করান এই নেতা। এই বছরের শুরুতে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে শুভেচ্ছা জানিয়ে শিক্ষক ও জিয়া পরিষদ নেতার টানা ব্যানার ছিঁড়ে ফেলেন।
'নেতৃত্বগুণ ও মাস্তানির পার্থক্য আছে'
নাদিম মাহমুদ লিখেছেন—'শুধু ছাত্রলীগ করার অপরাধে কারও শাস্তি হতে পারে এমন চিন্তাচেতনা যাঁরা ধারণ করেন—তাঁরা কিছুতেই চব্বিশের মূল চেতনা ধারণ করতে পারেন না। কেউ যদি একান্তভাবে ছাত্রলীগে থাকা অবস্থায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ে—যার বিরুদ্ধে মামলা আছে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টরিয়াল বডিতে অভিযোগ আছে—নিশ্চয় সেটি দেশের প্রচলিত আইন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে। কিন্তু এটা কিছুতেই রাকসুর নেতাদের কাজ নয় যে আপনি শিক্ষার্থীদের ধরে ধরে ছাত্রলীগ ট্যাগ দেবেন, মারধর করবেন, প্রশাসনকে চাপ দিয়ে গ্রেপ্তার করাবেন।'
তিনি আরও লিখেছেন—'মনে রাখবেন—এমন কাজ অতীতে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিল, যাঁদের বিরুদ্ধে আপনারা আন্দোলন করেছিলেন—তাঁদের নেতৃত্ব এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই। এখন আপনারাও যদি একই কাজ করেন—তাহলে আপনারাও সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে ঘৃণিত হয়ে উঠবেন। নেতার নেতৃত্বগুণ আর মাস্তানির গুণের মধ্যে তফাৎ আছে। বিশ্ববিদ্যালয় কখনোই মাস্তানির জায়গা নয়।'
'রাকসুর জিএসের কাজ কী? তাঁর দপ্তরে কি ভুক্তভোগী ওই নারী শিক্ষার্থী কোনো অভিযোগ দিয়ে সমাধান চেয়েছিলেন? যদি না চান—তিনি কেন প্রক্টর অফিসে গিয়ে হাঙ্গামা করলেন? নিষিদ্ধ থাকা ছাত্রলীগ তালাশের দায়িত্বই বা তাঁকে কে দিয়েছে?'—নাদিম মাহমুদ, গবেষক, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়
💬 মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!