📌 ১৮৩৫ সালে নির্মিত রূপলাল হাউস ঢাকার শ্যামপুরে বুড়িগঙ্গার তীরে দাঁড়িয়ে আছে। একসময় এই প্রাসাদে নাচ-গান ও সাংস্কৃতিক আসর আয়োজন হত, কিন্তু বর্তমানে তা মসলা ব্যবসায়ীদের গুদামে পরিণত হয়েছে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তালিকায় থাকা সত্ত্বেও ভবনটি অবহেলার শিকার
বুড়িগঙ্গার তীরে ঢাকার পুরান অংশে দাঁড়িয়ে আছে একটা জরাজীর্ণ প্রাসাদ, যেটি একসময় ঢাকার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের কেন্দ্র ছিল। সেই প্রাসাদটি হলো রূপলাল হাউস। ১৯ শতকের শেষভাগে নির্মিত এই দ্বিতল ভবনটি আজ অবহেলার শিকার। একসময় এই প্রাসাদে লর্ড ডাফরিনের নাচের আসর আয়োজন হত, কিন্তু বর্তমানে তা মসলা ব্যবসায়ীদের গুদামে পরিণত হয়েছে।
🔴 মূল পয়েন্ট
- 📌 ১৮৩৫ সালে ঢাকার শ্যামপুরে নির্মিত রূপলাল হাউসের মূল মালিক ছিলেন রূপলাল দাস ও তার ভাই রঘুনাথ দাস, যারা আর্মেনীয় জমিদার আরাতুনের কাছ থেকে ১৮২৫ সালে নির্মিত ‘আরাতুন হাউস’ কিনে পুনর্নির্মাণ করেছিলেন।
- 📌 ৯১.৪৪ মিটার দীর্ঘ এই প্রাসাদে ৫০টিরও বেশি কক্ষ ছিল এবং গ্রিক ডোরিক স্থাপত্যশৈলী অনুসরণ করে নির্মিত হয়েছিল।
- 📌 ১৮৮৮ সালে ভারতের ভাইসরয় লর্ড ডাফরিনের নাচের আসর আয়োজনের জন্য রূপলাল হাউসকে নির্বাচিত করা হয়। আসর আয়োজনের জন্য মালিকদের খরচ হয়েছিল প্রায় ৪৫ হাজার টাকা।
- 📌 প্রাসাদে একসময় ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ ও ওস্তাদ ওয়ালীউল্লাহ খাঁসহ বিখ্যাত সংগীতজ্ঞদের পারফর্ম্যান্সের আসর বসত। কবি কাজী নজরুল ইসলামও এখানে বেশ কয়েকবার উপস্থিত ছিলেন।
- 📌 ১৯৪৭ সালের পর রূপলাল দাসের পরিবার দেশত্যাগ করলে ভবনটি অবহেলার শিকার হয়। বর্তমানে এটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংরক্ষিত পুরাকীর্তির তালিকায় রয়েছে, কিন্তু স্থানীয় ব্যবসায়ীদের গুদাম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
📰 বিস্তারিত
বিকেলের ম্লান আলোতে ঢাকার পুরান অংশে ফরাশগঞ্জের শ্যামপুরে বুড়িগঙ্গার তীরে দাঁড়িয়ে আছে রূপলাল হাউস। এই জরাজীর্ণ প্রাসাদটি একসময় ঢাকার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের কেন্দ্র ছিল। ১৮২৫ সালে আর্মেনীয় জমিদার আরাতুন এই ভবনটি নির্মাণ করেন এবং নাম দেন ‘আরাতুন হাউস’। ১০ বছর পর ১৮৩৫ সালে তিনি বাড়িটি বিক্রি করেন ঢাকার ব্যবসায়ী রূপলাল দাস ও তার ভাই রঘুনাথ দাসের কাছে। তারা কলকাতার মার্টিন অ্যান্ড কোং কোম্পানিকে দিয়ে ভবনটি পুনর্নির্মাণ করেন এবং নাম পরিবর্তন করে ‘রূপলাল হাউস’ রাখেন।
গ্রিক ডোরিক স্থাপত্যশৈলীর এই প্রাসাদটির মূল আকর্ষণ ছিল এর বিশাল হলরুম এবং বুড়িগঙ্গা অভিমুখী জমকালো নাচঘর। প্রাসাদটির দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ৯১.৪৪ মিটার এবং ছোট-বড় মিলিয়ে ৫০টিরও বেশি কক্ষ ছিল। ভবনের ছাদ নির্মাণ করা হয়েছিল কোরিনথীয় রীতিতে। নদীর দিকে সম্মুখভাগে একটি বড় ঘড়ি ছিল, যা বুড়িগঙ্গা নদীতে চলাচলকারী নৌযান থেকে স্পষ্ট দেখা যেত। কিন্তু ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে ঘড়িটি ভেঙে পড়ার পর আর ঠিক করা হয়নি।
১৮৮৮ সালে ভারতের ভাইসরয় লর্ড ডাফরিন ঢাকা সফরে এসেছিলেন। সে সময় তাঁর সম্মানে রূপলাল হাউসে বল নাচবল নাচের আসর আয়োজন করা হয়। আসর আয়োজনের জন্য ইংরেজরা ভবনটি দুই দিনের জন্য দুই শ টাকায় ভাড়া নিয়েছিল। তবে লর্ড ডাফরিনকে অভ্যর্থনা জানাতে ভবনটি সাজাতেই মালিকদের খরচ হয়েছিল প্রায় ৪৫ হাজার টাকা। এই ঘটনা থেকে বোঝা যায়, সে সময় রূপলাল পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য ও সামাজিক মর্যাদা কতটা ছিল। শুধু নাচের আসর নয়, একসময় এই প্রাসাদে নিয়মিত উচ্চাঙ্গ সংগীতের আসর বসত। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ ও ওস্তাদ ওয়ালীউল্লাহ খাঁসহ বিখ্যাত সংগীতজ্ঞরা এখানে পারফর্ম করেছেন। কবি কাজী নজরুল ইসলামও এই ভবনে বেশ কয়েকবার উপস্থিত ছিলেন।
১৯৪৭ সালের পর রূপলাল দাসের পরিবার দেশত্যাগ করলে ভবনটি তার জৌলুশ হারায়। একসময় যে ভবনে অভিজাতদের নাচ-গান ও সাংস্কৃতিক আসর বসত, সেখানে সময়ের সঙ্গে জমতে থাকে অবহেলা ও নিস্তব্ধতা। ১৯৫৮ সালে মোহাম্মদ সিদ্দিক জামাল বাড়িটি কিনে এর নাম দেন ‘জামাল হাউস’। তবে ‘রূপলাল হাউস’ নামেই এখনো এর খ্যাতি। বর্তমানে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংরক্ষিত পুরাকীর্তির তালিকায় থাকা সত্ত্বেও ভবনটির অবস্থা উদ্বেগজনক। স্থানীয় মসলা ও সবজি ব্যবসায়ীদের গুদামঘর হিসেবে ভবনের বিভিন্ন অংশ ব্যবহৃত হচ্ছে। চারপাশের বাজারের কোলাহল, মসলার গন্ধ, শ্রমিকদের ব্যস্ততা আর ক্রেতা-বিক্রেতার হাঁকডাকে চাপা পড়ে গেছে স্থাপনাটির ঐতিহাসিক পরিচয়।
"রূপলাল হাউস তাই কেবল একটি পুরোনো ভবন নয়; এটি ঢাকার হারিয়ে যেতে বসা নগর-ঐতিহ্যের প্রতীক। এর দেয়ালে জমে থাকা সময়ের দাগ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ঐতিহ্য শুধু সংরক্ষিত তালিকায় নাম লিখে রাখার বিষয় নয়, তাকে বাঁচিয়ে রাখারও প্রয়োজন আছে।"
📊 তথ্যের সারসংক্ষেপ
- 📍 স্থান: ঢাকার ফরাশগঞ্জ, শ্যামপুর, বুড়িগঙ্গার তীর
- 👥 খবরের মুখ্য ব্যক্তি: রূপলাল দাস, রঘুনাথ দাস, লর্ড ডাফরিন, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, ওস্তাদ ওয়ালীউল্লাহ খাঁ, কাজী নজরুল ইসলাম
- 🔢 গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা: ১৮৩৫ (নির্মাণ বছর), ৯১.৪৪ মিটার (দৈর্ঘ্য), ৫০+ কক্ষ, ৪৫ হাজার টাকা (অভ্যর্থনা খরচ)
💬 মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!