📌 পাবনার আটঘরিয়া উপজেলার চাঁন্দাই গ্রামের মানুষের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় নির্মিত হচ্ছে ১২৫ ফুট দীর্ঘ ‘চাঁন্দাই জনতা এক্সপ্রেস’ নামের একটি বাইচের নৌকা। প্রায় ১৫ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিতব্য এই নৌকাটি তৈরিতে গ্রামবাসীর পাশাপাশি প্রবাসীরাও চাঁদা দিয়েছেন
পাবনার আটঘরিয়া উপজেলার চাঁন্দাই গ্রামে ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচের ঐতিহ্য ধরে রাখতে নির্মিত হচ্ছে ১২৫ ফুট দীর্ঘ একটি বিশালাকার বাইচের নৌকা। নাম দেওয়া হয়েছে ‘চাঁন্দাই জনতা এক্সপ্রেস’। প্রায় ১৫ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিতব্য এই নৌকাটি তৈরিতে গ্রামের কৃষক, শ্রমিক, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে প্রবাসীরাও স্বতঃস্ফূর্তভাবে চাঁদা দিয়েছেন।
🔴 মূল পয়েন্ট
- 📌 নির্মাণাধীন নৌকার দৈর্ঘ্য: ১২৫ ফুট
- 📌 নির্মাণ ব্যয়: প্রায় ১৫ লাখ টাকা
- 📌 নৌকার নাম: ‘চাঁন্দাই জনতা এক্সপ্রেস’
- 📌 নৌকা তৈরিতে অংশগ্রহণকারী পেশাজীবী: কৃষক, শ্রমিক, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী ও প্রবাসীরা
- 📌 চাঁন্দাই গ্রামের ঐতিহ্য: প্রায় চার দশকের নৌকাবাইচের ইতিহাস
- 📌 নৌকাবাইচ দলের অর্জন: জাতীয় প্রতিযোগিতায় দুইবার প্রথম স্থান অধিকার
- 📌 নৌকা নির্মাণের সময়কাল: দেড় থেকে দুই মাস
📰 বিস্তারিত
পাবনার আটঘরিয়া উপজেলার একদন্ত ইউনিয়নের চাঁন্দাই গ্রামে গড়ে উঠেছে ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচের একটি নতুন অধ্যায়। গ্রামের মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় নির্মিত হচ্ছে ১২৫ ফুট দীর্ঘ ‘চাঁন্দাই জনতা এক্সপ্রেস’ নামের বিশালাকার বাইচের নৌকা। প্রায় ১৫ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিতব্য এই নৌকাটির নামকরণে স্থান পেয়েছে ‘জনতা’ শব্দটি, যা গ্রামবাসীর ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার প্রতীক।
গ্রামের প্রবীণদের মতে, চাঁন্দাই গ্রামে নৌকাবাইচের ঐতিহ্য শুরু হয়েছিল ১৯৮৮ সালে। তখন থেকেই কৃষক, শ্রমিকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ মিলে গড়ে তোলেন বাইচালদের দল। সময়ের পরিক্রমায় এই দলটি দেশের বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠিত নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে সাফল্য অর্জন করে। বুড়িগঙ্গা নদীতে অনুষ্ঠিত জাতীয় নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতায় দুইবার প্রথম স্থান অধিকার করে দলটি। ফলে নৌকাবাইচ শুধু খেলা নয়, চাঁন্দাই গ্রামের মানুষের কাছে এটি হয়ে উঠেছে ঐতিহ্য ও আবেগের অংশ।
গ্রামের ৮০ বছর বয়সী গোলজার হোসেন একসময় ছিলেন একজন বাইচাল। যুবক বয়সে তিনি নৌকায় বসে বইঠা টেনেছেন। বর্তমানে বয়সের ভারে তিনি আর বাইচে অংশ নিতে পারেন না। তবে নৌকাবাইচের প্রতি তাঁর টান এখনো অটুট। তিনি প্রতিদিনই নৌকা তৈরির স্থানে এসে কিছুক্ষণ সময় কাটান। একই গ্রামের ৬২ বছর বয়সী নায়েব আলী জানান, তাঁদের পরিবারে কয়েক প্রজন্ম ধরে নৌকাবাইচের ঐতিহ্য চলে আসছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের বাপ-চাচারা বাইচ দিতেন, তারপর আমরা, এখন ছেলেরা খেলছে। খুব ভালো লাগে।’
৫০ বছরের অভিজ্ঞ কারিগর দুলাল চন্দ্র সূত্রধর (৭০) নির্মাণ করছেন ‘চাঁন্দাই জনতা এক্সপ্রেস’। তিনি তাঁর বাবার কাছ থেকে নৌকা তৈরির কাজ শিখেছিলেন। এরপর প্রায় ৫০ বছর ধরে তিনি নিজেই নৌকা নির্মাণ করে আসছেন। দেশের বিভিন্ন জেলায় গিয়ে তিনি এ পর্যন্ত প্রায় ৭০টি বাইচের নৌকা নির্মাণ করেছেন। দুলাল চন্দ্র সূত্রধর জানান, সাধারণ নৌকার তুলনায় বাইচের নৌকা নির্মাণ করা অনেক বেশি কঠিন। তিনি বলেন, ‘এ ধরনের নৌকা তৈরিতে শাল, গর্জন ও সেগুন কাঠ ব্যবহার করা হয়। আগুনে কাঠ পুড়িয়ে প্রয়োজনমতো বাঁকানো হয়। এরপর লোহার পাত ও পেরেক দিয়ে জোড়া লাগানো হয় কাঠের বিভিন্ন অংশ।’
নৌকা নির্মাণের সময় প্রতিটি অংশের মাপ ঠিক রাখতে হয়। একটি বাইচের নৌকা নির্মাণ করতে দেড় থেকে দুই মাস সময় লাগে। নৌকার আকার অনুযায়ী কারিগরেরা দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত মজুরি নিয়ে থাকেন। গ্রামবাসীর স্বতঃস্ফূর্ত চাঁদা সংগ্রহের মাধ্যমে ‘চাঁন্দাই জনতা এক্সপ্রেস’ নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রবাসীরাও এই উদ্যোগে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন।
নৌকা পরিচালনা কমিটির সদস্য ও একদন্ত ইউনিয়ন পরিষদের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আসাদুল ইসলাম জানান, নৌকাবাইচ গ্রামবাংলার ঐতিহ্য। এই ঐতিহ্য ধরে রাখতেই গ্রামের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে ঐক্যবদ্ধ। তিনি বলেন, ‘এই গ্রাম থেকে তিনটি নৌকা তৈরি হয়েছে। এখন চতুর্থ নৌকাটি নির্মাণ করা হচ্ছে। গ্রামের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করেছেন।’
নৌকাটি নির্মাণ শেষ হলে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হবে। এরপর পরীক্ষামূলক বাইচ অনুষ্ঠিত হবে। পরে দেশের বিভিন্ন এলাকার প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে দলটির। নতুনদের সঙ্গে অভিজ্ঞ বাইচালরাও থাকবেন বলে জানান নৌকার মাঝি আবু সাঈদ। তিনি বলেন, ‘নৌকা নির্মাণ হলেই অনুশীলন শুরু হবে। আমাদের লক্ষ্য দেশের বিভিন্ন স্থানের বাইচে অংশ নেওয়া।’
"একসময় বাপ-চাচারা বাইচ দিতেন, তারপর আমরা, এখন ছাওয়ালরা বাইচ খেলে। খুব ভালো লাগে।" — নায়েব আলী (৬২), চাঁন্দাই গ্রাম
📊 তথ্যের সারসংক্ষেপ
- 📍 স্থান: চাঁন্দাই গ্রাম, একদন্ত ইউনিয়ন, আটঘরিয়া, পাবনা
- 👥 খবরের মুখ্য ব্যক্তি: দুলাল চন্দ্র সূত্রধর (৭০), গোলজার হোসেন (৮০), নায়েব আলী (৬২), আসাদুল ইসলাম
- 🔢 গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা: ১২৫ ফুট, ১৫ লাখ টাকা, ৫০ বছর, ৭০টি নৌকা, ৮০ বছর, ৬২ বছর
💬 মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!