📌 রংপুরের শেরমস্ত গ্রামের কৃষক মাইদুল ইসলাম কেঁচো সার তৈরির মাধ্যমে নিজের জীবন ও জমি বদলিয়েছেন। রাসায়নিক সার থেকে জৈব সারে পরিবর্তনের এই বিপ্লব আশপাশের কৃষকদেরও অনুপ্রাণিত করেছে। কেঁচো সার উৎপাদন ও বিক্রি থেকে মাসে ৪০ হাজার টাকা আয় করছেন তিনি
রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার শেরমস্ত গ্রামের কৃষক মাইদুল ইসলাম (৩৮) কেঁচো সার তৈরির মাধ্যমে নিজের জীবন ও জমি বদলিয়েছেন। রাসায়নিক সার থেকে জৈব সারে পরিবর্তনের এই বিপ্লব আশপাশের কৃষকদেরও অনুপ্রাণিত করেছে। কৃষি বিভাগের প্রশিক্ষণ নিয়ে শুরু করা এই উদ্যোগ এখন তাঁর আয়ের অন্যতম উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে।
🔴 মূল পয়েন্ট
- 📌 শেরমস্ত গ্রামের কৃষক মাইদুল ইসলাম (৩৮) রাসায়নিক সার থেকে কেঁচো সারে পরিবর্তন করে জীবন ও জমি বদলিয়েছেন
- 📌 ২০২৩ সালে নিজের তিন একর আমন ধানের খেতে সমস্যা দেখা দিলে মাইদুল কেঁচো সার তৈরির প্রশিক্ষণ নেন
- 📌 মাসে ৭ থেকে ৮ টন কেঁচো সার উৎপাদন করে মাসে ৪০ হাজার টাকা আয় করছেন মাইদুল
- 📌 কেঁচো সার তৈরির কৌশল শিখে শেরমস্ত ও আশপাশের গ্রামের অনেক কৃষক জৈব চাষে রুচি দেখাচ্ছেন
- 📌 কেঁচো সার বিক্রি করে মাসে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা আয় করছেন রশিদা বেগম
- 📌 রাসায়নিক সার ব্যবহার কমিয়ে ২০ হাজার টাকা সাশ্রয় করছেন মজিবুর রহমান
📰 বিস্তারিত
শেরমস্ত গ্রামে মাইদুল ইসলামের নাম বললে অনেকেই প্রশ্ন করেন, ‘কোন মাইদুল? কেঁচো মাইদুল?’ এই নামের পেছনে রয়েছে রাসায়নিক সার থেকে কেঁচো সারে পরিবর্তনের গল্প। একসময় রাসায়নিক সারনির্ভর চাষাবাদ করতেন মাইদুল। ২০২৩ সালে নিজের তিন একর আমন ধানের খেতে সমস্যা দেখা দিলে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা শরিফুল ইসলাম তাঁকে জানান, অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহারের কারণে মাটির উর্বরতা কমে যেতে পারে। সমস্যার সমাধান খুঁজতে গিয়ে মাইদুল জানতে পারেন কেঁচো সার বা কেঁচো কম্পোস্টের কথা।
কৃষি বিভাগের প্রশিক্ষণ নিয়ে বাড়ির উঠানে কেঁচো সার তৈরির শুরু করেন মাইদুল। নিজের জমিতে ব্যবহার করে ভালো ফলন পাওয়ার পর বাড়তে থাকে তাঁর আগ্রহ। এখন সেটিই হয়ে উঠেছে তাঁর আয়ের অন্যতম উৎস। শুধু মাইদুলের জীবনই বদলায়নি; তাঁর কাছ থেকে কেঁচো সার তৈরির কৌশল শিখে শেরমস্ত ও আশপাশের গ্রামের অনেক কৃষক এই পথে হাঁটছেন। কেউ নিজের জমির জন্য সার তৈরি করছেন, কেউ আবার সার ও কেঁচো বিক্রি করে বাড়তি আয় করছেন।
মাইদুলের বাবা জয়নাল আবেদীন ছিলেন এলাকার বড় কৃষক। তাঁর প্রায় সাত একর জমি ছিল। কৃষিকাজই ছিল পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস। বাবাকে দেখে ছোটবেলা থেকেই কৃষিকাজের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় মাইদুলের। তবে ২০২৩ সালের অভিজ্ঞতা তাঁকে নতুন করে ভাবায়। কৃষি বিভাগের ‘অনাবাদি পতিত জমি ও বসতবাড়ির আঙিনায় পারিবারিক পুষ্টি বাগান স্থাপন প্রকল্প’-এর আওতায় মাইদুল কেঁচো সার তৈরির প্রশিক্ষণ পান। প্রশিক্ষণ শেষে বাড়ির উঠানে টিনের চালা তুলে ২০টি সিমেন্টের রিং বসান মাইদুল। তাঁর নিজের একটি গরুর খামার আছে, সেখান থেকে সংগ্রহ করা গোবর রিংগুলোয় দেন। প্রশিক্ষণ থেকে পাওয়া কেঁচো ছেড়ে দেন সেখানে। প্রায় এক মাস পর ২০টি রিং থেকে পাওয়া যায় প্রায় এক হাজার কেজি কেঁচো সার।
মাসে সাত থেকে আট টন কেঁচো সার উৎপাদন করে মাসে ৪০ হাজার টাকা আয় করছেন মাইদুল। বর্তমানে তিনি শেরমস্ত ও আশপাশের গ্রামের কৃষকেরা তো বটেই, বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকেও মানুষ তাঁর কাছ থেকে সার কিনে নিয়ে যান। কেঁচো সার তৈরির মূল উপাদান গোবর। গোবর কেনা, শ্রমিকের খরচসহ প্রতি কেজি কেঁচো সার উৎপাদনে তাঁর খরচ পড়ে গড়ে ৬ টাকা। তিনি সার বিক্রি করেন ১৩ টাকা কেজি দরে। সার তৈরি হতে সময় লাগে ৩০ থেকে ৩৫ দিন।
মাইদুলের এই উদ্যোগের প্রভাব পড়েছে আশপাশের কৃষকদের জীবনে। ফাজিলপুর গ্রামের কৃষক মজিবুর রহমান (৪২) একসময় রাসায়নিক সার কিনতে গিয়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন। ২০২৪ সালে মাইদুলের কাছ থেকে কেঁচো নিয়ে দুটি সিমেন্টের রিংয়ে কেঁচো সার তৈরি শুরু করেন। এখন তাঁর রিংয়ের সংখ্যা পাঁচ। নিজের উৎপাদিত কেঁচো সার তাঁর দুই বিঘা জমিতে ব্যবহার করেন। রাসায়নিক সার ব্যবহার কমিয়ে নিজের তৈরি জৈব সার ব্যবহার করায় সার কেনার প্রায় ২০ হাজার টাকা সাশ্রয় হচ্ছে বলে জানান তিনি।
পাতিলভাঙ্গা গ্রামের রশিদা বেগম (৩৬) স্বামী মারা যাওয়ার পর দুই সন্তানকে নিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হতো। তিন বিঘা জমির ফসলের ওপর নির্ভর করেই চলত সংসার। প্রায় দেড় বছর আগে মাইদুলের কাছ থেকে কেঁচো নিয়ে বাড়িতে কেঁচো কম্পোস্ট তৈরি শুরু করেন তিনি। এখন নিজেদের জমিতে সেই সার ব্যবহার করেন। পাশাপাশি কেঁচো ও কেঁচো সার বিক্রি করে বছরে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা আয় করছেন।
"কেঁচো হামার ভাগ্য খুলি দিছে। এ গ্রামকে হামরা রাসায়নিক সারমুক্ত করমু।"
📊 তথ্যের সারসংক্ষেপ
- 📍 স্থান: শেরমস্ত গ্রাম, তারাগঞ্জ উপজেলা, রংপুর
- 👥 খবরের মুখ্য ব্যক্তি: মাইদুল ইসলাম (৩৮), মজিবুর রহমান (৪২), রশিদা বেগম (৩৬), শরিফুল ইসলাম (উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা)
- 🔢 গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা: ৩৮ বছর (মাইদুলের বয়স), ৭-৮ টন (মাসিক কেঁচো সার উৎপাদন), ৪০ হাজার টাকা (মাসিক আয়), ২০ হাজার টাকা (সাশ্রয়), ৩০-৩৫ দিন (সার তৈরির সময়)
💬 মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!