📌 বাংলার প্রাচীন ঘুমপাড়ানি ছড়া ‘খোকা ঘুমালো, পাড়া জুড়ালো, বর্গি এলো দেশে’-এ লুকিয়ে আছে মারাঠা বর্গির আক্রমণের ইতিহাস। ১৮শ শতাব্দীর বাংলায় মারাঠা বাহিনী কর্তৃক চালানো লুটতরাজের নির্মম স্মৃতি এ ছড়ায় প্রতিফলিত হয়েছে
বাংলার শৈশবের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে পরিচিত ‘খোকা ঘুমালো, পাড়া জুড়ালো, বর্গি এলো দেশে’ ছড়াটির শুরুতেই লুকিয়ে আছে মারাঠা বর্গির আক্রমণের নির্মম ইতিহাস। এই ছড়াটি শিশুদের ঘুম পাড়ানোর জনপ্রিয় উপায় হয়ে উঠলেও এর ভেতরে তৎকালীন বাংলার সাধারণ মানুষের জীবনযাপনের কঠোর সত্য প্রতিফলিত হয়েছে।
🔴 মূল পয়েন্ট
- 📌 ১৮শ শতাব্দীর মাঝামাঝি মারাঠা বর্গি বাহিনী বাংলায় ধারাবাহিক লুটপাট চালায়, যার স্মৃতি লোকসাহিত্যে অবশিষ্ট
- 📌 ‘বর্গি’ শব্দটি মারাঠা সেনাবাহিনীর ‘বারগির’ থেকে এসেছে, যারা দ্রুতগতির অশ্বারোহী সৈন্য হিসেবে পরিচিত
- 📌 ১৭৪২ থেকে ১৭৫১ সাল পর্যন্ত বর্ধমান, বীরভূম, হুগলি, মেদিনীপুরসহ বিস্তৃত অঞ্চলে বর্গির আক্রমণে কৃষক, ব্যবসায়ী ও তাঁতির সম্পদ নষ্ট হয়
- 📌 ‘মারাঠা ডিচ’ নামে পরিচিত কলকাতার চারপাশের পরিখা খনন করা হয় ইংরেজদের আক্রমণ প্রতিরোধে
- 📌 ছড়ার লাইন ‘বুলবুলিতে ধান খেয়েছে, খাজনা দেব কিসে?’ কৃষিনির্ভর অর্থনৈতিক সংকটের প্রতীক
- 📌 ১৭৫১ সালে নবাব আলিবর্দি খাঁ মারাঠাদের সঙ্গে সন্ধি করে, কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবনে আতঙ্কের ছাপ দীর্ঘকাল অবশিষ্ট থাকে
📰 বিস্তারিত
প্রতিদিনের মতো সন্তানকে ঘুম পাড়ানোর সময় বাংলার ঐতিহ্যবাহী ছড়া ‘খোকা ঘুমালো, পাড়া জুড়ালো, বর্গি এলো দেশে’ শোনানো হয়। কিন্তু এই ছড়ার ‘বর্গি’ কে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে জানা যায়, এই শব্দটি মারাঠা সাম্রাজ্যের অশ্বারোহী বাহিনীর ‘বারগির’ থেকে এসেছে। ১৮শ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে নবাব আলিবর্দি খাঁর শাসনামলে বাংলা ছিল কৃষি ও বাণিজ্যের দিক থেকে সমৃদ্ধ। কিন্তু এই সময়ে মারাঠা শাসক রঘুজি ভোসলের নেতৃত্বে সেনাপতি ভাস্কর পণ্ডিতের নেতৃত্বে মারাঠা বাহিনী বাংলায় আক্রমণ চালায়।
১৭৪২ থেকে ১৭৫১ সাল পর্যন্ত প্রায় দশ বছর ধরে বর্গি বাহিনী বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে আক্রমণ চালায়। বর্ধমান, বীরভূম, মুর্শিদাবাদ, হুগলি, মেদিনীপুরসহ বিস্তৃত অঞ্চলে তাদের আক্রমণে কৃষকদের ফসল, ব্যবসায়ীদের দোকান ও তাঁতির কর্মশালা লুটপাটের শিকার হয়। দ্রুতগতির অশ্বারোহী বাহিনী হঠাৎ গ্রামে প্রবেশ করে লুটপাট চালাত, যার ফলে সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে পড়ে। কৃষকদের গোলা, ব্যবসায়ীদের সম্পদ সবই নিরাপদ ছিল না। এই আতঙ্কের কারণে কলকাতাও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে এবং ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ‘মারাঠা ডিচ’ নামে পরিচিত একটি পরিখা খনন করে আক্রমণ প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেয়।
ছড়াটির লাইন ‘বুলবুলিতে ধান খেয়েছে, খাজনা দেব কিসে?’-এ ধরা পড়ে কৃষিনির্ভর অর্থনৈতিক সংকটের ইঙ্গিত। ফসলহানি, লুটপাট ও খাজনার চাপে সাধারণ মানুষের জীবন কতটা দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল, তা এই ছড়ার ভাষায় অনুভব করা যায়। তবে ছড়াটির প্রতিটি অংশে সরাসরি ঐতিহাসিক ঘটনার বিবরণ থাকলেও, লোকমুখে ছড়াটি পরিবর্তিত ও পরিবর্ধিত হয়েছে। কিন্তু এর মধ্যে বর্গি আতঙ্কের স্মৃতি বাংলার লোকজ ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে অবশিষ্ট রয়েছে।
"‘খোকা ঘুমালো, পাড়া জুড়ালো, বর্গি এলো দেশে’— এই ছড়ার শুরুতেই ‘বর্গি এলো দেশে’ বলা হচ্ছে, সেই বর্গি কারা? কেন তাদের আগমন নিয়ে এমন একটি ছড়া তৈরি হয়েছিল?"
📊 তথ্যের সারসংক্ষেপ
- 📍 স্থান: বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল (বর্ধমান, বীরভূম, মুর্শিদাবাদ, হুগলি, মেদিনীপুর), কলকাতা
- 👥 খবরের মুখ্য ব্যক্তি: নবাব আলিবর্দি খাঁ, সেনাপতি ভাস্কর পণ্ডিত, মারাঠা শাসক রঘুজি ভোসল
- 🔢 গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা: ১৭৪২-১৭৫১ (আক্রমণের সময়কাল), ১৭৫১ (সন্ধি স্বাক্ষরিত বছর)
💬 মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!