📌 কক্সবাজারের দক্ষিণ টেকপাড়ার আমেনা বেগম ৩৭ বছর বয়সে স্বামীর নির্যাতন ও স্ট্রোকের পরেও জীবনকে নতুনভাবে গড়েছেন। তিনি শ্রেষ্ঠ ‘অদম্য নারী’ সম্মাননা পেয়েছেন এবং বর্তমানে টিউশনি ও কৃষিকাজের মাধ্যমে নিজের জীবনকে টার্নিং পয়েন্টে নিয়ে গেছেন
কক্সবাজারের দক্ষিণ টেকপাড়ার আমেনা বেগমের জীবন একটি অদম্য সংগ্রামের গল্প। দারিদ্র্য, নির্যাতন, স্ট্রোক এবং স্বামীর তালাকের পরেও তিনি নিজের জীবনকে নতুনভাবে গড়েছেন। বাবা মোহাম্মদ আলীর কঠোর পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা এই নারী ২০২৬ সালে ‘শ্রেষ্ঠ অদম্য নারী’ সম্মাননা পেয়েছেন।
🔴 মূল পয়েন্ট
- 📌 **৩৭ বছর বয়সী আমেনা বেগম** কক্সবাজারের দক্ষিণ টেকপাড়ার বাসিন্দা, যিনি ১১ বছর স্বামীর নির্যাতন সহ্য করার পর স্ট্রোক পেয়েছিলেন এবং ঘর থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিলেন।
- 📌 **২০২৩ সালের জুলাইতে স্বামী ও শ্বশুরবাড়ি তাকে তাড়িয়ে দেয়**, যখন তিনি স্ট্রোকের পর সুস্থ হয়ে উঠছিলেন।
- 📌 **তালাকের পর ১ লাখ টাকা দেনমোহর পেয়ে** তিনি মায়ের বাড়িতে নিজের ঘর তৈরি করেন এবং টিউশনি ও কৃষিকাজ শুরু করেন।
- 📌 **মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়** তাঁকে ‘শ্রেষ্ঠ অদম্য নারী’ সম্মাননা প্রদান করে, যা অবহেলিত নারীদের জন্য অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করছে।
- 📌 **৩৫ কিলোমিটার দূরে উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে** চাকরি করার সময় তিনি নিজের পড়াশোনা ও মায়ের চিকিৎসা চালিয়ে যেতেন।
📰 বিস্তারিত
আমেনা বেগমের জীবনের শুরু ছিল কঠিন। বাবা মোহাম্মদ আলী একজন লাবণচাষি ছিলেন, যিনি দিনের পর দিন কষ্টে পরিবারের পাঁচ মেয়ের ও দুই ছেলের খাবার তুলতেন। আমেনা, সাত ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট, এই পরিবারের কষ্ট দেখে বড় হয়েছিলেন। তিনি উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং কক্সবাজার সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। কিন্তু বাবার মৃত্যুর পর পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থা আরও খারাপ হয়।
অদম্য আমেনা দমে যাননি। তিনি টিউশনি ও স্বেচ্ছাসেবী কাজ করে নিজের পড়াশোনা চালিয়ে যান। ২০০৮ সালে বাবার মৃত্যুর পর তিনি উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে একটি বেসরকারি সংস্থায় চাকরি নেন। প্রতিদিন সকালে কক্সবাজার শহর থেকে ৩৫ কিলোমিটার দূরে কর্মস্থলে যেতেন এবং সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে রান্না, নিজের লেখাপড়া ও অসুস্থ মায়ের সেবা করতেন। চার বছর চাকরি করার পর তিনি মায়ের চিকিৎসা ও নিজের পড়াশোনা চালিয়ে যান এবং কক্সবাজার সরকারি কলেজ থেকে বাংলা বিষয়ে অনার্স সম্পন্ন করেন।
বৈবাহিক জীবনে আমেনার পথ ছিল আরও কঠিন। চকরিয়া উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নের এক নিম্নবিত্ত পরিবারে বিয়ে হয় তাঁর। চাকরি থাকাকালীন তিনি শ্বশুরবাড়িতে টাকা দিতেন, কিন্তু চাকরি হারানোর পর নির্যাতন শুরু হয়। ১১ বছর বিবাহিত জীবনে তিনি শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন। সন্তান না হওয়ার অপবাদে শাশুড়ি, ননদ ও দেবররা তাঁকে অপবাদ দিতেন। এই অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে তিনি স্ট্রোক পান। দুই মাস হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে সুস্থ হয়ে যখন শ্বশুরবাড়িতে ফেরার চেষ্টা করেন, তখন ২০২৩ সালের জুলাই মাসে তাঁকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়।
২০২৪ সালের আগস্টে স্বামী তাঁকে তালাক দেন এবং ২০২৫ সালের নভেম্বরে আনুষ্ঠানিকভাবে বিচ্ছেদ ঘটে। তালাকের পর সালিস বৈঠকে তিনি কাবিনের দেনমোহর বাবদ ১ লাখ টাকা পান। এই টাকা ও নিজের সঞ্চয়কে তিনি জীবনের ‘টার্নিং পয়েন্ট’ হিসেবে ব্যবহার করেন। মায়ের ভিটায় তিনি দুই কক্ষের একটি ঘর তৈরি করেন এবং বাকি টাকা বিনিয়োগ করেন টিউশনি ও কৃষিকাজে। বাড়ির ছাদে তিনি রঙিন মাছের পোনার চাষ শুরু করেন, যা শহরের দোকানে বিক্রি হয়। পাশাপাশি তিনি বিষমুক্ত শাকসবজির খামার গড়ে তোলেন।
"নির্যাতনের বিভীষিকা মুছে ফেলে নতুন উদ্যমে জীবন শুরু করেছেন আমেনা বেগম। তাঁর এই সাফল্য সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।"
মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক সুব্রত বিশ্বাসের এই উক্তি। গত মে মাসে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর তাঁকে ‘শ্রেষ্ঠ অদম্য নারী’ সম্মাননা প্রদান করে। আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ ও বেগম রোকেয়া দিবস উপলক্ষে কক্সবাজারে অনুষ্ঠিত অনুষ্ঠানে এই সম্মাননা প্রদান করা হয়।
📊 তথ্যের সারসংক্ষেপ
- 📍 স্থান: কক্সবাজার, দক্ষিণ টেকপাড়া (৭ নম্বর ওয়ার্ড), উখিয়া, কুতুপালং রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির
- 👥 খবরের মুখ্য ব্যক্তি: আমেনা বেগম, মোহাম্মদ আলী, সুব্রত বিশ্বাস
- 🔢 গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা: ৩৭ বছর (বয়স), ১১ বছর (বিবাহিত জীবন), ৩৫ কিলোমিটার (চাকরির দূরত্ব), ১ লাখ টাকা (দেনমোহর)
💬 মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!