📌 খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলার তিন নারী—ননতা ত্রিপুরা, রিপাই মারমা ও চেউং মারমা—জুমচাষ, কৃষি ও বাণিজ্য থেকে নিজস্ব উপার্জন করে পরিবারের জীবনযাত্রা উন্নত করছেন। তাদের সংগ্রামের গল্প হলো অভাবের লড়াই থেকে নিজের অবস্থান গড়ে তোলার প্রত্যাশা
খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলার তিন নারী—ননতা ত্রিপুরা, রিপাই মারমা ও চেউং মারমা—জীবনের প্রতিটি দিনকে সংগ্রামের কাহিনীতে রূপান্তর করেছেন। তাদের জীবনযাত্রার গল্প হলো জুমচাষ, কৃষি, বাণিজ্য ও নিজস্ব উপার্জনের মাধ্যমে পরিবারের দায়িত্ব পালন এবং সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার প্রত্যাশা। এই তিন নারীর জীবনযাত্রার ধরন আলাদা হলেও তাদের মধ্যে একটি সাধারণ বন্ধন রয়েছে—প্রতিদিনের শ্রম, জীবিকার অনিশ্চয়তা এবং পরিবারের প্রতি অটুট দায়িত্ববোধ।
🔴 মূল পয়েন্ট
- 📌 **৫০ বছর বয়সী ননতা ত্রিপুরা** জুমচাষের পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী পোশাক **রিনাই-রিসা** বোনেন এবং পশু পালন করেন, যা পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস হিসেবে কাজ করে।
- 📌 **৩৫ বছর বয়সী রিপাই মারমা** দৈনিক **৩০০ থেকে ৭০০ টাকা** আয় করেন সবজি বিক্রি করে, কিন্তু বৃষ্টি বা সময়মতো বিক্রি না হলে লোকসানের ঝুঁকি থাকে।
- 📌 **২৬ বছর বয়সী চেউং মারমা** স্নাতকোত্তর পড়েন এবং পরিবারের আর্থিক চাপ কমাতে নিজের পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন।
- 📌 তিন নারীরই স্বামী-স্ত্রী মিলে পরিবারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা তাদের জীবনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনে।
- 📌 **জুমচাষের পাশাপাশি** ননতা **পশু পালন, বনজ খাদ্য সংগ্রহ এবং ঐতিহ্যবাহী পোশাক বোনা** করে বাড়তি আয় করেন।
- 📌 রিপাই **পাঁচ বছর ধরে** সবজি বিক্রি করে সংসার চালাচ্ছেন, কিন্তু পুঁজির অভাব তাকে আরও বেশি বিক্রি করার থেকে বিরত রাখে।
📰 বিস্তারিত
খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় বসবাসকারী ননতা ত্রিপুরা (৫০) প্রতিদিনের জীবন শুরু করেন ভোরের আলো ফোটার আগেই। তিনি এবং তার স্বামী জুমচাষের পাশাপাশি ধান, তিল, হলুদ, কুমড়া, আদা, মারফা, চিনাল, বেগুন এবং পাহাড়ি মসলা চাষ করেন। জুমের কাজে ননতা সমান অংশীদার, কিন্তু তিনি আরো একটি উপায়ে নিজের উপার্জন বৃদ্ধি করেন—**কোমরতাঁতে বোনা ঐতিহ্যবাহী পোশাক রিনাই-রিসা**। একটি পোশাক তৈরি করতে এক সপ্তাহ বা তারও বেশি সময় লাগে, কিন্তু এটি তার বাড়তি আয়ের প্রধান উৎস। পাশাপাশি তিনি শূকর, ছাগল ও হাঁস-মুরগি পালন করেন এবং জঙ্গল থেকে ঢেঁকিশাক, কচু, বাঁশকোঁড়লসহ বিভিন্ন বনজ খাদ্য সংগ্রহ করে বাজারে বিক্রি করেন।
ননতা বলেন, ‘আগে সংসারের সব সিদ্ধান্ত নিত আমার স্বামী। এখন দুজন মিলেই সিদ্ধান্ত নিই। নিজের মতটা স্পষ্ট করে বলি’। তিনি এবং তার স্বামী প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ পাননি, তাই তাদের তিন ছেলেকে পড়াশোনা করাতে চান। বড় ছেলে আত্মীয় বাড়িতে থেকে খাগড়াছড়ি কলেজে, মেজ ছেলে গাজীপুরে একটি আশ্রম পরিচালিত হোস্টেলে দশম শ্রেণিতে এবং ছোট ছেলে গ্রামের বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ছে। সন্তানদের পড়াশোনার খরচ জোগাতে জুমচাষের পাশাপাশি বাড়তি কাজ করতে হয় ননতাকে।
৩৫ বছর বয়সী রিপাই মারমা প্রতিদিন ভোরের আলো ফোটার আগেই ঘুম থেকে ওঠেন। তিনি সকাল আটটার দিকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরের পানছড়ি বাজারে যান এবং সেখানে সবজি বিক্রি করেন। দৈনিক আয় হয় **৩০০ থেকে ৭০০ টাকা**, কিন্তু বৃষ্টি বা সময়মতো বিক্রি না হলে লোকসান হবার সম্ভাবনা থাকে। রিপাই আগে গরু-ছাগল পালন ও দিনমজুরি করতেন, পরে স্বামীর সঙ্গে পাড়ায় মুদিদোকান ও চায়ের দোকান খুলেছিলেন। কিন্তু দেনা বেড়ে যাওয়ায় দোকান চালাতে পারেননি। তারপর তিনি সবজি বিক্রি শুরু করেন। তিনি বলেন, ‘আগে সংসারের সব সিদ্ধান্ত নিত আমার স্বামী। এখন দুজন মিলেই সিদ্ধান্ত নিই। বাজার থেকে কী আনব, কত টাকা কোথায় খরচ করব, সন্তানদের পড়াশোনার জন্য কীভাবে টাকা রাখব—এসব বিষয়ে স্বামীর সঙ্গে আলোচনা করি।’
পাঁচ কিলোমিটার দূরে বসবাসকারী **২৬ বছর বয়সী চেউং মারমা** স্নাতকোত্তর পড়েন। তিনি বলেন, ‘বাবা মংথাক মারমা জুমচাষি ছিলেন। জুমের ফসল দিয়ে পরিবারের সবার খাবারের চাহিদা মেটানো কঠিন ছিল। সন্তানদের পড়াশোনার খরচ জোগানোও তাঁর পক্ষে সহজ ছিল না। বড় চার ভাইবোন প্রাথমিকের গণ্ডি পেরোতে পারেননি। এমন পরিস্থিতিতে নিজের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি পরিবারের ওপর আর্থিক চাপ কমানোর পথ খুঁজতে চলেছেন।’
"আমরা পড়াশোনা করতে পারিনি। তাই ছেলেদের পড়াশোনা করাতে চাই। ওরা যেন আমাদের মতো শুধু কষ্টের কাজ করে জীবন কাটাতে বাধ্য না হয়। তাদের পড়াশোনার খরচ চালানো সহজ নয়। তবু মনে হয়, এই কষ্ট একদিন সার্থক হবে।"
📊 তথ্যের সারসংক্ষেপ
- 📍 স্থান: খাগড়াছড়ি উপজেলা, পানছড়ি, দুর্গম পাহাড়ি এলাকা
- 👥 খবরের মুখ্য ব্যক্তি: ননতা ত্রিপুরা (৫০), রিপাই মারমা (৩৫), চেউং মারমা (২৬)
- 🔢 গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা: ৫০ বছর (ননতা), ৩৫ বছর (রিপাই), ৩০০-৭০০ টাকা (রিপাইয়ের দৈনিক আয়), ২৬ বছর (চেউং)
💬 মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!