📌 বাংলাদেশে হামের নজিরবিহীন প্রাদুর্ভাব চলছে। ১৫ মার্চ থেকে ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১ লাখ ৭৫ হাজার ১৯৮ জন সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হয়েছেন এবং ১ হাজার ৪৪ জন মারা গেছেন। টিকাদানের হার কমে যাওয়ায় এই মহামারি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে
বাংলাদেশে হামের মহামারি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। জাতীয় স্বাস্থ্য কর্মসূচির সাফল্যের ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও, টিকাদানের হারের অবনতি এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক ব্যাঘাতের কারণে এই সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী ‘সায়েন্টিফিক আমেরিকান’-এর এক বিস্তৃত প্রতিবেদনে এই চিত্রের বিশদ বিবরণ পাওয়া গেছে।
🔴 মূল পয়েন্ট
- 📌 ১৫ মার্চ থেকে ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১ লাখ ৭৫ হাজার ১৯৮ জন সন্দেহভাজন হামের রোগী শনাক্ত হয়েছে, যার মধ্যে ১ হাজার ৪৪ জন মারা গেছেন — সবচেয়ে বেশি মৃত্যু ঘটেছে দুই বছরের কম বয়সী টিকা না পাওয়া শিশুদের মধ্যে।
- 📌 ২০০৫ সালের পর থেকে বাংলাদেশে এটিই সবচেয়ে মারাত্মক হামের মহামারি, যেখানে টিকাদানের হার ২০২৫ সালে ৮৬ শতাংশে নেমে আসে — ২০১৯ সালে এটি ছিল ৯৭ শতাংশ।
- 📌 ইউনিসেফের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৪ লাখ শিশু হামের জন্য প্রয়োজনীয় সব টিকা পায়নি, যার মধ্যে ৭০ হাজার শিশু কোনো টিকাও পায়নি।
- 📌 জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকৃত আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে, বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলে চিকিৎসা সুবিধার অভাবের কারণে।
- 📌 ২০২০ সালের কোভিড-১৯ মহামারি, ২০২৪ সালের টিকা ক্রয়ের নীতির পরিবর্তন, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং মার্কিন ইউএস এআইডির তহবিল কাটছাঁট — এই সবই হামের মহামারির পেছনে মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
📰 বিস্তারিত
বাংলাদেশের হাসপাতাল ও মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীরা হামের নজিরবিহীন প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১৫ মার্চ থেকে ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশজুড়ে অন্তত ১ লাখ ৭৫ হাজার ১৯৮ জন সন্দেহভাজন হামের রোগী শনাক্ত করা হয়েছে। এ সময় হাম ও হামজনিত জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে অন্তত ১ হাজার ৪৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। মৃতদের অধিকাংশই দুই বছরের কম বয়সী এবং টিকা না পাওয়া শিশু।
বিশেষজ্ঞরা জানান, প্রকৃত আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা এই সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত ও গ্রামীণ অঞ্চলে চিকিৎসা ও টিকাদানের সুযোগ সীমিত থাকায় বহু ঘটনা হিসাবের বাইরে থেকে যাচ্ছে।
কিন্তু কীভাবে বাংলাদেশ এত দ্রুত এই মহামারির শিকার হয়েছে? ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলির জনসংখ্যা ও সংক্রামক ব্যাধি বিশেষজ্ঞ ড. আয়েশা মাহমুদ বলেছেন, ‘বাংলাদেশে বেড়ে ওঠার সময় আমরা কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর গভীর আস্থা রেখেছি। স্থানীয় ক্লিনিক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে সচেতনতা তৈরির শক্তিশালী ইতিহাস ছিল এ দেশে, যা ঘরে ঘরে টিকাদান নিশ্চিত করেছিল।’
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে বাংলাদেশে হামের প্রথম ডোজের টিকা পাওয়ার হার ছিল ৯৭ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ডোজের ক্ষেত্রে তা ছিল ৯৩ শতাংশ। ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যবর্তী সময়ে বাংলাদেশে প্রতিবছর হামে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল মাত্র ১০০ থেকে ৩০০-এর মধ্যে। কিন্তু পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে শুরু করে টিকাদানের হার কমে যাওয়ার সাথে সাথে।
টেক্সাস এঅ্যান্ডএম বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য যোগাযোগ গবেষক এবং ইউনিসেফ বাংলাদেশের সাবেক কর্মকর্তা শাকিল ফয়েজউল্লাহ বলেছেন, ‘হামের মতো ভাইরাস কোনো দয়া দেখায় না। নিয়মিত টিকাদান প্রক্রিয়ায় সামান্যতম বিচ্যুতি বা ফাঁক তৈরি হলেই এটি দ্রুত থাবা বসায়—বাংলাদেশে ঠিক সেটাই ঘটেছে।’
বিশেষজ্ঞরা এই মহামারি ছড়িয়ে পড়ার পেছনে একাধিক জটিল কারণকে দায়ী করেছেন। জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের মহামারি বিশেষজ্ঞ ড. উইলিয়াম মস বলেছেন, এটি একটি ‘পারফেক্ট স্টর্ম’ বা বহুমুখী সংকটের সম্মিলিত ফল। ২০২০ সালে কোভিড-১৯ মহামারির সময়ে শিশুদের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে প্রথম বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটে। ২০২৪ সালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পর ওষুধ ও টিকা ক্রয়ের পুরোনো প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনা হয়, যার ফলে টিকার মজুত হঠাৎ কমে যায়। রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং মার্কিন ইউএস এআইডির তহবিল কাটছাঁটের কারণে স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়োগ এবং সরবরাহ শৃঙ্খল বজায় রাখা ব্যাহত হয়।
ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যান্ডেমিক সেন্টারের পরিচালক ড. জেনিফার নুজো বলেছেন, হামের সাধারণ লক্ষণ হল লালচে র্যাশ ও জ্বর, কিন্তু এটি নিউমোনিয়া বা মস্তিষ্কে মারাত্মক প্রদাহের মতো জীবনঘাতী জটিলতা তৈরি করতে পারে। হামের সংক্রমণ পুরোপুরি ঠেকানোর একমাত্র উপায় হলো অন্তত ৯৫ শতাংশ জনগোষ্ঠীকে টিকাদানের আওতায় আনা, যাকে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ বা যৌথ প্রতিরোধ ক্ষমতা বলা হয়।
"বাংলাদেশে বেড়ে ওঠার সময় আমরা কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর গভীর আস্থা রেখেছি। স্থানীয় ক্লিনিক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে সচেতনতা তৈরির শক্তিশালী ইতিহাস ছিল এ দেশে, যা ঘরে ঘরে টিকাদান নিশ্চিত করেছিল।"
📊 তথ্যের সারসংক্ষেপ
- 📍 স্থান: বাংলাদেশ (দেশজুড়ে)
- 👥 খবরের মুখ্য ব্যক্তি: ড. আয়েশা মাহমুদ, ড. শাকিল ফয়েজউল্লাহ, ড. উইলিয়াম মস, ড. জেনিফার নুজো
- 🔢 গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা: ১ লাখ ৭৫ হাজার ১৯৮ জন রোগী, ১ হাজার ৪৪ জন মৃত্যু, ৯৭ শতাংশ (২০১৯ সালের টিকা কভারেজ), ৮৬ শতাংশ (২০২৫ সালের টিকা কভারেজ), ৪ লাখ শিশু টিকা থেকে বঞ্চিত
💬 মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!