📌 পুলিশ সদর দপ্তর সিটিটিসি ও এটিইউ-এর নাম স্পেশাল রেসপন্স ইউনিট ও স্পেশাল রেসপন্স টিম ডিএমপি করার প্রস্তাব দিয়েছে। ২৮ জুলাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়নি। গুম, নির্যাতন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে নাম বদল—ড. তৌহিদুল হক বলেন কাজের পরিবর্তন দরকার।
পুলিশের দুই বিশেষায়িত সন্ত্রাসবিরোধী ইউনিট—কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ও অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট (এটিইউ)-এর নাম পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। প্রস্তাব করা হয়েছে নাম বদলে 'স্পেশাল রেসপন্স ইউনিট' ও 'স্পেশাল রেসপন্স টিম ডিএমপি' করার। ২৮ জুলাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ইন্টারনাল বৈঠক হলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি। শুভ্র দেবের প্রতিবেদন।
🔴 মূল পয়েন্ট
- পুলিশ সদর দপ্তর ৭ জুন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠায়—এটিইউ-এর নাম পরিবর্তন করে 'স্পেশাল সিকিউরিটি ইউনিট (এসএসইউ)' করার অনুমোদন চায়।
- ৮ জুন ডিএমপি কমিশনারকে চিঠিতে সিটিটিসি-এর নাম 'স্পেশাল সিকিউরিটি ইউনিট-ডিএমপি (এসএসইউ-ডিএমপি)' করার কথা বলা হয়; পরে নাম বদলে প্রস্তাব পাঠানো হয়—এটিইউ 'স্পেশাল রেসপন্স ইউনিট (এসআরইউ)' ও সিটিটিসি 'স্পেশাল রেসপন্স টিম ডিএমপি (এসআরইউ ডিএমপি)'।
- সিটিটিসি গঠিত হয় ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ডিএমপি-এর অধীনে—সাতটি সাব-বিভাগ নিয়ে: সোয়াট, সাইবার ক্রাইম, ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম, ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড অ্যানালাইসিস, বোম্ব ডিসপোজাল, কে-নাইন।
- হলি আর্টিজান হামলার পর সিটিটিসি কল্যাণপুর, শাহ আলী, বংশাল, মোহাম্মদপুর, তেজগাঁও, ডেমরা, যাত্রাবাড়ী, আশকোনা, কেরানীগঞ্জ, পাতারটেক (গাজীপুর), টাঙ্গাইল, নারায়ণগঞ্জ, সিরাজগঞ্জে অভিযান চালায়।
- কল্যাণপুরে 'নব্য জেএমবি'-র ৯ জন, নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ায় ৩ জন, গাজীপুরের পাতারটেকে ৭ জন নিহত—কল্যাণপুরের ঘটনায় অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা হয়েছে।
- এটিইউ গঠিত ২০১৭ সালে—সারা দেশে কাজ করে, পুলিশ সদর দপ্তরের তত্ত্বাবধানে, প্রধান একজন অতিরিক্ত আইজিপি।
- ৫ আগস্ট ২০২৪ আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গুম, আটক, হত্যা ও নির্যাতনের অভিযোগ—'মায়ের ডাক'-এর সমন্বয়ক ও বিএনপি নারী আসনের এমপি সানজিদা ইসলাম তুলি বলেছেন এসব ইউনিটে গোপন বন্দিশালা ছিল।
- গত শুক্রবার মতিঝিল মেট্রো রেলের নিচ থেকে উল্টো রথযাত্রাকে টার্গেট করে পাইপ বোমা (আইইডি)—১.৫ কেজি সালফার, তারকাঁটা ও ধারালো লোহা—উদ্ধার।
- ২৬ ডিসেম্বর হাসনাবাদ হাউজিং মাদ্রাসায় বিস্ফোরণ—পরিচালক আল আমিনের ভাড়া বাসা থেকে ৪০০ লিটার তরল রাসায়নিক, হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড, এসিটোন, নাইট্রিক অ্যাসিড ও ৯টি ককটেল জব্দ।
নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব: দুই দফা নাম
সাম্প্রতিক সময়ে সিটিটিসি ও এটিইউ-এর নাম পরিবর্তনের পাশাপাশি তাদের কর্মপরিধি বাড়ানোর পরিকল্পনা করে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এজন্য দুই দফা নাম প্রস্তাব করা হয়েছে পুলিশ সদর দপ্তরের চিঠিতে। পুলিশ সদর দপ্তর গত ৭ জুন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক প্রস্তাবে এটিইউ-এর নাম পরিবর্তন করে 'স্পেশাল সিকিউরিটি ইউনিট (এসএসইউ)' করার অনুমোদন চেয়েছে। তাদের যুক্তি, দেশে ও বিশ্বে নিরাপত্তা হুমকির ধরন দ্রুত বদলাচ্ছে—সহিংস উগ্রবাদের পাশাপাশি নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আরও বিস্তৃত কাঠামো প্রয়োজন।
এছাড়া ৮ জুন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনারের কাছে পাঠানো আরেকটি চিঠিতে ডিএমপি-র কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের নাম পরিবর্তন করে 'স্পেশাল সিকিউরিটি ইউনিট-ডিএমপি (এসএসইউ-ডিএমপি)' করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। পরে আবার নাম পরিবর্তন করে প্রস্তাব পাঠানোর কথা বলা হয়—সেখানে অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটের নাম 'স্পেশাল রেসপন্স ইউনিট (এসআরইউ)' ও কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের নাম 'স্পেশাল রেসপন্স টিম ডিএমপি (এসআরইউ ডিএমপি)' করার প্রস্তাব করা হয়েছে। গতকাল (২৮ জুলাই) এ নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি ইন্টারনাল বৈঠক হয়েছে। তবে বৈঠকে পুরোপুরি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, বৈঠক হয়েছে, তবে সিদ্ধান্ত হয়নি। এটা শুধু নাম পরিবর্তন হবে; কার্যক্রমে তেমন পরিবর্তন আনা না-ও হতে পারে।
সিটিটিসি-এর ইতিহাস ও অভিযান
দেশে ২০১৪, ২০১৫ ও ২০১৬ সালে উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদ বেড়ে যাওয়ায় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ২০১৬ সালে ডিএমপি-র একটি বিশেষায়িত ইউনিট সিটিটিসি গঠন করে। ওই বছরের ফেব্রুয়ারিতে এই ইউনিট আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করে। এর কাজের এলাকা ঢাকা মহানগর। এটি সাতটি সাব-বিভাগে বিভক্ত—স্পেশাল অ্যাকশন গ্রুপ (সোয়াট), সাইবার ক্রাইম তদন্ত বিভাগ, ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম, ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড অ্যানালাইসিস, বোম্ব ডিসপোজাল টিম ও বিশেষ প্রশিক্ষিত কে-নাইন টিম (শ-৯)। ঢাকায় বড় কোনো ইভেন্ট হলে সোয়াট নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।
২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে নৃশংস জঙ্গি হামলার পর ওই বছরে সিটিটিসি কল্যাণপুর, শাহ আলী, বংশাল, মোহাম্মদপুর, তেজগাঁও, ডেমরা, যাত্রাবাড়ী, আশকোনা, কেরানীগঞ্জ, গাজীপুরের পাতারটেক, টাঙ্গাইল, নারায়ণগঞ্জ, সিরাজগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বেশ কিছু বাড়িতে অভিযান চালায়। পুলিশ তখন বলেছিল, ওসব বাড়ি 'জঙ্গি আস্তানা'। অভিযানে কল্যাণপুরে 'নব্য জেএমবি'-র ৯ জন, নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ায় ৩ জন, গাজীপুরের পাতারটেকে ৭ জনসহ বিভিন্ন স্থানে অনেকে নিহত হয়। পুলিশ নিহত ব্যক্তিদের জঙ্গি হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল। সিটিটিসি-এর ওই সব অভিযান নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠেছে। কল্যাণপুরে 'জাহাজবাড়ীতে' ৯ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে মামলাও হয়েছে।
গুম, আটক ও নির্যাতনের অভিযোগ
সিটিটিসি গঠনের এক বছর পর ২০১৭ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার সারা দেশে উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসবাদ দমনে পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট এটিইউ গঠন করেছিল। সারা দেশে কাজ করা এই ইউনিট পুলিশ সদর দপ্তরের তত্ত্বাবধানে চলে। এই ইউনিটের প্রধান একজন অতিরিক্ত আইজিপি।
গণ-অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সিটিটিসি ও এটিইউ-এর কর্মকাণ্ড নিয়ে অনেকেই মুখ খুলেছেন। এ দুই ইউনিটের বিরুদ্ধে গুম, আটক রাখা, হত্যা ও নির্যাতনের অভিযোগও ওঠে। গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্বজনদের নিয়ে গঠিত সংগঠন 'মায়ের ডাক'-এর সমন্বয়ক এবং বর্তমান সংসদের বিএনপি-র সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি সানজিদা ইসলাম তুলি বলেন, এসব ইউনিটে গোপন বন্দিশালা ছিল। সেখানে মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়েছে, নির্যাতন করা হতো। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত গুমসংক্রান্ত কমিশনের প্রতিবেদনেও সিটিটিসি ও এটিইউ-এর বিরুদ্ধে নির্যাতন ও এগুলোর গোপন বন্দিশালা থাকার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়।
সাম্প্রতিক ঘটনা: মতিঝিল পাইপ বোমা ও হাসনাবাদ মাদ্রাসা বিস্ফোরণ
উগ্রবাদী ও সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম থেমে নেই। গত শুক্রবার (২৪ জুলাই) মতিঝিল মেট্রো রেলের নিচ থেকে শক্তিশালী একটি টাইমবোমা উদ্ধার করে সেটির নিরাপদ বিস্ফোরণ ঘটায় পুলিশ। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উল্টো রথযাত্রার র্যালি ওই রাস্তা দিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। তার কিছুক্ষণ আগেই সেটি পুলিশের নজরে আসে। পুলিশ বলছে, উল্টো রথযাত্রাকে টার্গেট করে ওই শক্তিশালী বোমাটি পাতা হয়েছিল। এটি ছিল পাইপ বোমা (আইইডি বা ইম্প্রোভাইসড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস)—ভেতরে দেড় কেজির মতো সালফার, প্রচুর তারকাঁটা ও ধারালো লোহার টুকরো, ব্যাটারি ও সার্কিট। মামলার এজাহারে মতিঝিল থানার এসআই মো. মুক্তা বলেছেন, সরকারের ভাবমূর্তি বিনষ্ট করতে পূর্বপরিকল্পিতভাবে বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে জনগণের জীবন বিপন্ন করার লক্ষ্যে বোমাটি সেখানে পাতা হয়েছিল।
গত ২৬ ডিসেম্বর সকাল সাড়ে ১০টার দিকে হাসনাবাদ হাউজিং এলাকার একটি মাদ্রাসা ভবনে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণের তীব্রতায় কক্ষের চারপাশের দেয়াল ও ছাদের একাংশ ধসে পড়ে। দুই দিনব্যাপী অভিযানে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় ওই মাদ্রাসার পরিচালক ও প্রধান আসামি আল আমিনের ভাড়া বাসা থেকে বিপুল পরিমাণ বোমা তৈরির সরঞ্জাম জব্দ করা হয়—হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড, এসিটোন, নাইট্রিক অ্যাসিড ও ৪০০ লিটার তরল রাসায়নিক, কালো প্লাস্টিকে মোড়ানো ৯টি তাজা ককটেল। গত এপ্রিল মাসে জাতীয় সংসদসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ও রাষ্ট্রীয় স্থাপনায় জঙ্গি সংগঠনের সম্ভাব্য হামলার পরিকল্পনার বিষয়ে গোয়েন্দা সতর্কতা জারি করে বাংলাদেশ পুলিশ—পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি কামরুল আহসানের সই করা দাপ্তরিক চিঠির মাধ্যমে।
'নাম বদলে বিতর্কমুক্ত হওয়া কঠিন'—ড. তৌহিদুল হক
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক মানবজমিনকে বলেছেন, শুধু নাম পরিবর্তন করে বিতর্কমুক্ত হওয়া খুব কঠিন। নাম ও পোশাক পরিবর্তনের রাজনীতি বহু পুরনো—এগুলো এখন আর মানুষ গ্রহণ করে না। মানুষ এখন দেখতে চায় কাজের পরিবর্তন। যেসব কাজ নিয়ে অভিযোগ রয়েছে—সেসব কাজের পরিবর্তন, সংশোধন এবং আইনসিদ্ধভাবে বাস্তবায়ন মানুষ সেটিই দেখতে চায়। এছাড়া এই ইউনিটের কাজকে একটি আইনগত ভিত্তি দেওয়া গেলে খুব ভালো হবে। যদি তা সম্ভব না-ও হয়, তাহলে অন্তত একটি সুস্পষ্ট গাইডলাইন বা নির্দেশনা থাকা উচিত, যেখানে উল্লেখ থাকবে এই ইউনিট বা একীভূত ইউনিট কী কী কাজ করবে।
'শুধু নতুন নাম দিলেই নতুন ভাবমূর্তি তৈরি হবে—বিষয়টি এমন নয়। একটি ইউনিট দীর্ঘদিন ধরে কাজ করলে সাধারণ মানুষের মধ্যে তার একটি পরিচিতি তৈরি হয়। কয়েক বছর পরপর যদি নাম পরিবর্তন হতে থাকে, তাহলে ইউনিটগুলো মানুষের কাছে গুরুত্ব হারাবে।'—ড. তৌহিদুল হক, অপরাধ বিশেষজ্ঞ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
💬 মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!