📌 নেপাল ও চীনের সীমান্তবর্তী রসুয়া জেলায় ভয়াবহ বরফ ও পাথরের ধসের ফলে সৃষ্ট কৃত্রিম হ্রদের বাঁধ ভেঙে ভয়াবহ বন্যা ও কাদাস্রোতে অন্তত ৪৬৯ জনের মৃত্যু এবং ১ হাজার ৪৬৮ জন নিখোঁজ হয়েছে। বিজ্ঞানীরা এর কারণ হিসেবে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও আধুনিক নগরায়ণের প্রভাবকে দায়ী করেছেন
নেপাল ও চীনের তিব্বত সীমান্তবর্তী রসুয়া জেলায় ঘটে যাওয়া ভয়াবহ বরফ ও পাথরের ধসের ফলে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা ও কাদা-পাথরের স্রোতে এক বিশাল মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। স্থানীয় সময় গত ২৬ আগস্ট সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে কাঠমান্ডু থেকে প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতায় এই ধস ঘটে। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস)-এর তথ্য অনুযায়ী, ধসের তীব্রতায় ভূ-পৃষ্ঠে রিখটার স্কেলে ৫ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্পের সমতুল্য কম্পন রেকর্ড করা হয়।
🔴 মূল পয়েন্ট
- 📌 অন্তত ৪৬৯ জনের মৃত্যু এবং ১ হাজার ৪৬৮ জন নিখোঁজ হওয়ার খবর নিশ্চিত হয়েছে।
- 📌 ধসের ফলে ‘লেন্দে খোলা’ নদী অববাহিকায় কৃত্রিম হ্রদ তৈরি হয়, যা পরবর্তীতে ভেঙে যায়।
- 📌 ভোটে কোশী ও ত্রিশূলী নদী অববাহিকার তিমুরে ও স্যাব্রুবেসির মতো এলাকা সম্পূর্ণ প্লাবিত হয়েছে।
- 📌 নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, তাদের সীমানায় ৯১০ জন নিখোঁজ রয়েছেন, যার মধ্যে ৫১৭ জন বিদেশি নাগরিক।
- 📌 চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, তাদের সীমানায় ২৬০ জন বিদেশিসহ মোট ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন।
📰 বিস্তারিত
হিমালয়ের রসুয়া জেলায় ঘটে যাওয়া এই বিপর্যয়ের ফলে সৃষ্ট কাদা ও পাথরের স্রোতে তিমুরে ও স্যাব্রুবেসির মতো এলাকায় একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, সেতু ও বসতি সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক পার্বত্য সমন্বিত উন্নয়ন কেন্দ্র (আইসিআইএমওডি) এবং কাঠমান্ডু বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ গবেষণায় উঠে এসেছে যে, হাজার হাজার টন বরফ ও পাথর পাহাড় থেকে খসে পড়ে ‘লেন্দে খোলা’ নদী অববাহিকায় আছড়ে পড়ে। এর ফলে নদীটির স্বাভাবিক প্রবাহ কিছু সময়ের জন্য অবরুদ্ধ হয়ে কৃত্রিম হ্রদ তৈরি হয়। পরবর্তীতে পানির প্রচণ্ড চাপে সেই বাঁধ ভেঙে গিয়ে ভয়াবহ বেগে কাদা, পাথর ও পানি নিচে নেমে আসে।
বিজ্ঞানীদের মতে, নেপাল ও হিমালয় অঞ্চল দুটি প্রধান টেকটোনিক প্লেটের (ইন্ডিয়ান প্লেট ও ইউরেশিয়ান প্লেট) সংযোগস্থলে অবস্থিত, যা বছরে প্রায় ২০ মিলিমিটার গতিতে একে অপরের মুখোমুখি সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে। এই ভৌগোলিক অবস্থানের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বায়ুমণ্ডলীয় উষ্ণতা বৃদ্ধি। ওয়াদিয়া ইনস্টিটিউট অব হিমালয়ান জিওলজির (ডব্লিউআইএইচজি) জ্যেষ্ঠ হিমবাহ বিশেষজ্ঞ ড. মণীশ মেহতা ব্যাখ্যা করেন, বিশ্বজুড়ে হিমালয়ের হিমবাহগুলো আশঙ্কাজনক হারে পিছু হটছে। গলিত হিমবাহের পেছনে বিপুল পরিমাণ আলগা পাথর, কাদা ও পলির স্তূপ রেখে যায়—যাকে ‘মরেন’ বলা হয়।
ড. মেহতা সতর্ক করেন, বাঁধ ভেঙে গেলে অথবা জলীয় চাপ বাড়লে এই আলগা মরেন পানির সঙ্গে মিশে নদীর স্বাভাবিক পানির ঘনত্ব বহু গুণ বাড়িয়ে দেয়, যা নদীর পারের সবকিছু গুঁড়িয়ে দেওয়ার শক্তি লাভ করে। নেপালের কাঠমান্ডুভিত্তিক সংস্থা আইসিআইএমওডি-এর ক্রিওস্ফিয়ার বিশেষজ্ঞ ড. মোহাম্মদ ফারুক আজম চীন থেকে প্রদত্ত এক সাক্ষাৎকারে এনডিটিভিকে জানান, প্রাথমিক বিশ্লেষণে এটিকে কেবল প্রাচীন হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যা বলা যায় না। এটি বরফ ও পাথরের যৌথ ধস, যা উপত্যকায় এক ভয়াবহ ক্যাস্কেডিং প্লাবন তরঙ্গের জন্ম দিয়েছে।
"আপনি যদি হিমালয়ের প্রাচীন আদিবাসীদের বসতি স্থাপনের কৌশল দেখেন, তবে দেখবেন তাঁরা নদী থেকে বেশ উঁচুতে পাহাড়ের ঢাল বা চূড়ায় বাড়িঘর বানাতেন। পানির জন্য নিচে নামতে হলেও থাকার জন্য নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিতেন। কিন্তু আধুনিক সময়ে নদীর একদম সংলগ্ন এলাকা, প্লাবনভূমি, এমনকি নদীর ওপর খুঁটি পুঁতে বাজার, ঘরবাড়ি ও হোটেল নির্মাণ করা হচ্ছে।"
ড. আজম আরও সতর্ক করে বলেন, মূল প্লাবন পার হয়ে যাওয়ার পরও বিপদ কাটেনি। বন্যার তীব্র ধাক্কায় উপত্যকার দু’পাশের পাহাড়ের ঢালগুলো মারাত্মকভাবে দুর্বল ও ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে। ফলে পরবর্তী কয়েক সপ্তাহ বা মাস ধরে সামান্য বৃষ্টিপাত বা ভূ-কম্পনেও নতুন করে ভূমিধস ঘটতে পারে।
📊 তথ্যের সারসংক্ষেপ
- 📍 স্থান: রসুয়া জেলা, নেপাল ও তিব্বত সীমান্তবর্তী অঞ্চল
- 👥 খবরের মুখ্য ব্যক্তি: ড. মণীশ মেহতা, ড. মোহাম্মদ ফারুক আজম
- 🔢 গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা: মৃত্যু ৪৬৯, নিখোঁজ ১ হাজার ৪৬৮
💬 মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!