📌 বাংলার চিত্রকলা দুর্ভিক্ষ ও ব্রিটিশ শোষণের কবলে পড়ে আত্মরক্ষার জন্য জন্ম নেয়। কোম্পানি শৈলীতে মোগল ও পাশ্চাত্য শিল্পের মিশ্রণ দেখা যায়, যা ১৮শ শতকের শেষ থেকে ১৯শ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত বিকশিত হয়। দুর্ভিক্ষ ও রাজস্ব আদায়ের অত্যাচারে শিল্পীরা জীবন রক্ষার জন্য নতুন শৈলী গড়ে তোলে
বাংলার চিত্রকলা আজ দুর্ভিক্ষ ও শোষণের কবলে পড়ে আত্মরক্ষার আকুতিতে জন্ম নেয়। এই শিল্পকলার দুটি প্রধান ধারা — পাশ্চাত্য শৈলী ও লোকজ শৈলী — দুর্ভিক্ষ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সৃষ্টি হয়। ফলে এই শিল্পকলাকে দুর্ভিক্ষপীড়িত অসহায় শিল্পীদের বেঁচে থাকার আকুতি হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। তবে এই শিল্পকলার সঙ্গে অভাবী মানুষের সংযোগ থাকলেও, ক্রমাগত দূরত্বই রচিত হয়। এই প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ থেকে জানা যায়, বাংলার চিত্রকলার ইতিহাসে ১৮ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে (১৭৭০-১৮৫০) ইংরেজ আমলে কোম্পানি শৈলীর সূচনা হয়।
🔴 মূল পয়েন্ট
- 📌 ১৮শ শতকের শেষ থেকে ১৯শ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত বিকশিত হয় কোম্পানি শৈলী, যা মোগল ও পাশ্চাত্য শিল্পের মিশ্রণে সৃষ্টি হয়
- 📌 ১৭৬৯ সালের মন্বন্তরে মুর্শিদাবাদ শৈলী ধীরে ধীরে লুপ্ত হয়ে যায়, দুর্ভিক্ষের প্রকোপে শিল্পীরা দেশান্তরিত হন
- 📌 ১৭৫৭ থেকে ১৭৬৬ সাল পর্যন্ত কোম্পানির কর্মচারীদের বাংলা ও বিহার থেকে উৎকোচ গ্রহণের মোট পরিমাণ ছিল ৬০ লাখ পাউন্ড (৪ কোটি ২০ লাখ টাকা)
- 📌 ১৭৭০ সালের দুর্ভিক্ষে বাংলার এক-তৃতীয়াংশ মানুষ মৃত্যুবরণ করে, সরকারি হিসাব অনুযায়ী প্রায় এক কোটি মানুষের মৃত্যু হয়
- 📌 কোম্পানি শৈলীতে শিল্পীরা নিজস্ব ধারার সঙ্গে পাশ্চাত্য রুচির সংযোগ ঘটাতে বাধ্য হন
📰 বিস্তারিত
বাংলার চিত্রকলার ইতিহাসে ১৮ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে (১৭৭০-১৮৫০) ইংরেজ আমলে কোম্পানি শৈলীর সূচনা হয়। এই শৈলীটি মোগল ও রাজপুত মিনিয়েচার এবং ইউরোপীয় কৌশলের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছিল। কোম্পানি শৈলী ১৭৫০-১৭৭০ সাল নাগাদ শুরু হয়ে ১৯ শতকের মাঝামাঝি (প্রায় ১৮৫০) পর্যন্ত চলে। মোগল চিত্রকলা (১৫৫০-১৭৫০) শতাধিক বছর মোগল দরবারে আনুকূল্য লাভের পর আওরঙ্গজেবের শাসনকালে শিল্পীদের কারখানার ঝাঁপ বন্ধ হয়ে যায়। পৃষ্ঠপোষকতা হারিয়ে অসহায় শিল্পী দল নতুন প্রতিপালকের আশায় ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে বাধ্য হন। বাংলার নবাবদের ছত্রচ্ছায়ায় মোগল শৈলীর পরম্পরায় উদ্ভূত মুর্শিদাবাদ শৈলী ১৭৬৯ সালের মন্বন্তরের ধাক্কায় ধীরে ধীরে লুপ্ত হয়ে যায়। দুর্ভিক্ষের প্রকোপে শিল্পীদের অনেকেই প্রাণ হারালেন অনাহারে, অনেকে হলেন দেশান্তরিত।
১৭৬৪-৬৫ সালে বাংলা ও বিহার থেকে রাজস্ব আদায় হয়েছিল প্রায় ১ কোটি ২৩ লাখ টাকা। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি রাজস্ব আদায়ের ভার গ্রহণের পর প্রথম বছরে, অর্থাৎ ১৭৬৫-৬৬ সালে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ বেড়ে হয় ২ কোটি ২০ লাখ টাকা। রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে স্থানীয় জনসাধারণের ওপর অমানুষিক নির্যাতনের বিষয়ও উল্লেখযোগ্য। একদিকে ব্যবসার নামে কোম্পানির অবাধ লুণ্ঠন ও ক্রমবর্ধমান হারে রাজস্ব আদায় চলতে থাকে, অন্যদিকে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে কোম্পানির কর্মচারীদের ব্যক্তিগত উৎকোচ গ্রহণের পরিমাণও। ১৭৬৬ সালে ইংল্যান্ডের পার্লামেন্ট নিযুক্ত অনুসন্ধান কমিটি কর্মচারীদের উৎকোচ গ্রহণের যে তালিকা প্রস্তুত করে, তাতে দেখা যায় ১৭৫৭ থেকে ১৭৬৬ সাল পর্যন্ত কোম্পানির কর্মচারীদের বাংলা ও বিহার থেকে উৎকোচ গ্রহণের মোট পরিমাণ ছিল ৬০ লাখ পাউন্ড (১৭৫০ থেকে ১৭৭০ সালের সমসাময়িক সময়ে ৬০ লাখ ব্রিটিশ পাউন্ডের মূল্য তত্কালীন স্থানীয় মুদ্রায় ছিল প্রায় ৪ কোটি ২০ লাখ টাকা)।
১৭৭০ সালের দুর্ভিক্ষে বাংলার এক-তৃতীয়াংশ মানুষ মৃত্যুর মুখে পতিত হয়। সরকারি হিসাব অনুযায়ী প্রায় এক কোটি মানুষের মৃত্যু হয় এই দুর্ভিক্ষে। তত্কালীন গভর্নর ওয়ারেন হেস্টিংস কোম্পানির পরিচালকদের চিঠি লিখে জানান, এমন ভয়ংকর বিপর্যয়ের সময়ে মানুষের ঘরে খাদ্যের জোগান না থাকলেও, রাজস্ব আদায় কমে যায়নি, বরং আগের বছরগুলো থেকে আরও বেড়েছে। তিনি অত্যন্ত হিংস্র ও নির্দয়ভাবে রাজস্ব আদায় করেছেন। এই শোষণ ও দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ে শিল্পীরা আত্মরক্ষার জন্য কোম্পানি শৈলী গড়ে তোলে, যা মোগল ও পাশ্চাত্য শিল্পের মিশ্রণে সৃষ্টি হয়।
"আমাদের চিত্রকলাকে বলা যেতে পারে দুর্ভিক্ষপীড়িত চিত্রকলা। কেননা সমকালীন বাংলায় চিত্রকলার দুই ধারা, অর্থাৎ পাশ্চাত্য শৈলী ও লোকজ শৈলী। এই দুটি ধারা তৈরি হয়েছে বহুমাত্রিক দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ে আত্মরক্ষার তাগিদে।"
📊 তথ্যের সারসংক্ষেপ
- 📍 স্থান: বাংলা, মুর্শিদাবাদ, ভারত
- 👥 খবরের মুখ্য ব্যক্তি: ওয়ারেন হেস্টিংস, শিল্পীরা, নবাবদের, ইংরেজদের
- 🔢 গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা: ১৭৭০-১৮৫০ (কালখণ্ড), ১৭৬৯ (মন্বন্তর), ১ কোটি ২৩ লাখ টাকা (রাজস্ব), ২ কোটি ২০ লাখ টাকা (রাজস্ব), ৬০ লাখ পাউন্ড (উৎকোচ), ৪ কোটি ২০ লাখ টাকা (উৎকোচের মূল্য)
💬 মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!