📌 ১৯২১ সালের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে কলকাতার এক গভীর রাতে কাজী নজরুল ইসলাম রচনা করেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবিতা ‘বিদ্রোহী’। মুজফ্ফর আহ্মদের স্মৃতিকথা ও ঐতিহাসিক দলিল থেকে উঠে আসে কবিতাটির রচনা ও প্রকাশের বিস্তারিত বিবরণ
কলকাতার তালতলা লেনের একটি বাড়ির দক্ষিণ-পূর্ব কোণের ঘরে ১৯২১ সালের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে এক গভীর রাতে বসে কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় কবিতা ‘বিদ্রোহী’। তাঁর জ্যেষ্ঠ বন্ধু কমরেড মুজফ্ফর আহ্মদ সেই রাতের সাক্ষী। রাত দশটার পর মুজফ্ফর ঘুমিয়ে পড়লে নজরুল জেগে থাকেন এবং পেনসিলে লেখেন এই মহাকাব্যিক সৃষ্টি।
🔴 মূল পয়েন্ট
- 📌 কলকাতার ৩/৪ সি, তালতলা লেনের বাড়ির দক্ষিণ-পূর্ব কোণের ঘরে রাতভর জেগে ‘বিদ্রোহী’ কবিতা লেখেন কাজী নজরুল ইসলাম
- 📌 মুজফ্ফর আহ্মদের স্মৃতিকথা অনুযায়ী, রাত দশটার পর তিনি ঘুমিয়ে পড়েছিলেন, সকালে উঠে নজরুল তাঁকে কবিতাটি পড়ে শোনান
- 📌 ‘বিদ্রোহী’ কবিতার প্রথম শ্রোতা ছিলেন মুজফ্ফর আহ্মদ, যিনি নিজেকে বর্ণনা করেছেন ‘নিরুত্তাপ শ্রোতা’ হিসেবে
- 📌 কবিতাটি লেখা হয়েছিল পেনসিলে, কারণ কারোরই তখন ফাউন্টেন পেন ছিল না
- 📌 ১৯২২ সালের ৬ জানুয়ারি প্রথম প্রকাশিত হয় ‘বিদ্রোহী’ সাপ্তাহিক বিজলী পত্রিকায়
- 📌 বিজলী পত্রিকার সম্পাদক অবিনাশচন্দ্র ভট্টাচার্য কবিতাটি শ্রুতলিখনের দাবি করলেও মুজফ্ফর আহ্মদ তা অস্বীকার করেন
📰 বিস্তারিত
১৯২১ সালের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহের একটি রাতে কলকাতার তালতলা লেনের ৩/৪ সি নম্বর বাড়ির দক্ষিণ-পূর্ব কোণের ঘরে কাজী নজরুল ইসলাম ও তাঁর জ্যেষ্ঠ বন্ধু কমরেড মুজফ্ফর আহ্মদ ছিলেন। রাত গভীর হওয়ার পর মুজফ্ফর আহ্মদ ঘুমিয়ে পড়েন। কিন্তু নজরুল জেগে থাকেন। সেই রাতেই তিনি লেখেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম আলোচিত ও প্রভাবশালী কবিতা ‘বিদ্রোহী’। ঠিক কোন সময়ে কবিতাটি লেখা হয়েছিল তা জানা যায়নি। তবে মুজফ্ফর আহ্মদের স্মৃতিকথা থেকে জানা যায়, তিনি রাত দশটার পর ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। পরদিন সকালে বিছানায় বসে মুখ-হাত ধুয়ে এসে তিনি দেখেন নজরুল তাঁকে জানাচ্ছেন একটি কবিতা লিখেছেন। তারপর পুরো কবিতাটি মুজফ্ফরকে পড়ে শোনান।
মুজফ্ফর আহ্মদ তাঁর স্মৃতিকথায় উল্লেখ করেছেন, ‘কোনো দিন কোনো বিষয়ে আমি উচ্ছ্বসিত হতে পারি না।’ তিনি আরও লেখেন, ‘নজরুল তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি আমাকে প্রথম পড়ে শোনাল। অথচ আমার স্বভাবের দোষে না পারলাম তাকে কোনো বাহ্বা দিতে, না পারলাম এতটুকু উচ্ছ্বসিত হতে।’ মুজফ্ফর আহ্মদের মতে, নজরুল নিজ হাতে কবিতাটি কপি করে দিয়েছিলেন। কারণ, তিনি কখনোই শ্রুতলিখনের মাধ্যমে কবিতা প্রকাশ করতে দিতেন না।
একই দিনে সকালে মোসলেম ভারত পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক আফজালুল হক নজরুলের ঘরে প্রবেশ করেন। মোসলেম ভারত-এর মুদ্রিত সম্পাদক ছিলেন শান্তিপুরের কবি মোজাম্মেল হক। তবে পত্রিকাটির নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন তাঁর ছেলে আফজালুল হক। নজরুল তাঁকেও কবিতাটি পড়ে শোনান। আফজালুল হক কবিতাটি সঙ্গে নিয়ে যান এবং একই দিনে তা প্রকাশের ব্যবস্থা করেন। এর কিছুক্ষণ পর সাপ্তাহিক বিজলী পত্রিকার সম্পাদক অবিনাশচন্দ্র ভট্টাচার্য নজরুলের বাসায় আসেন। তিনি কবিতাটি শুনে বলেন, ‘তুমি পাগল হয়েছ, নজরুল।’ তাঁর পরামর্শে নজরুল বিজলী পত্রিকায় কবিতাটি প্রকাশের জন্য কপি করে দেন।
১৯২২ সালের ৬ জানুয়ারি শুক্রবার সাপ্তাহিক বিজলী পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয় ‘বিদ্রোহী’ কবিতা। পত্রিকাটির সেই সংখ্যার চাহিদা এত বেশি ছিল যে দুইবার ছাপার প্রয়োজন হয়েছিল। তবে কিছু গবেষক দাবি করেছেন যে ‘বিদ্রোহী’ প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল মোসলেম ভারত-এর কার্তিক সংখ্যায়। মুজফ্ফর আহ্মদের মতে, আফজালুল হক কার্তিক সংখ্যার জন্য কপি নিয়ে গেলেও তা ফাল্গুন মাসের আগে প্রকাশিত হয়নি। ফলে বিজলী পত্রিকাকেই প্রথম প্রকাশক হিসেবে বিবেচনা করা যুক্তিযুক্ত।
অবিনাশচন্দ্র ভট্টাচার্য পরবর্তীকালে মাসিক বসুমতী পত্রিকায় লেখেন যে তিনি সেই দিন নজরুলের কবিতা শ্রুতলিখন করেছিলেন। তবে মুজফ্ফর আহ্মদ তা অস্বীকার করেন। তাঁর মতে, নজরুল নিজ হাতে কবিতাটি কপি করে দিয়েছিলেন। অন্যদিকে নলিনীকান্ত সরকার দাবি করেন যে তিনিই বিজলী পত্রিকায় কবিতাটি প্রকাশের জন্য নিয়ে গিয়েছিলেন। মুজফ্ফর আহ্মদ এ দাবিও প্রত্যাখ্যান করেন এবং বলেন যে অবিনাশচন্দ্র ভট্টাচার্যই কবিতাটি নিয়ে গিয়েছিলেন।
‘কোনো দিন কোনো বিষয়ে আমি উচ্ছ্বসিত হতে পারি না।…নজরুল তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি আমাকে প্রথম পড়ে শোনাল। অথচ আমার স্বভাবের দোষে না পারলাম তাকে কোনো বাহ্বা দিতে, না পারলাম এতটুকু উচ্ছ্বসিত হতে।’
📊 তথ্যের সারসংক্ষেপ
- 📍 স্থান: কলকাতা, তালতলা লেনের ৩/৪ সি নম্বর বাড়ি
- 👥 খবরের মুখ্য ব্যক্তি: কাজী নজরুল ইসলাম, মুজফ্ফর আহ্মদ, আফজালুল হক, অবিনাশচন্দ্র ভট্টাচার্য
- 🔢 গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা: ৬ জানুয়ারি ১৯২২, ২২ পৌষ ১৩২৮ সাল, ৩/৪ সি, ১২টা, ৬ জানুয়ারি
💬 মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!