📌 চাঁপাইনবাবগঞ্জের বরেন্দা গ্রামে ১৯৫০ সালের তেভাগা আন্দোলনের সক্রিয় কর্মীদের পরিবারকে প্রথমবারের মতো স্মরণ করা হয়েছে। ২৪ অক্টোবর বন্ধুসভার আয়োজনে আন্দোলনের ইতিহাস ও নিহত কর্মীদের স্মরণে আলোচনা ও সম্মাননা প্রদান করা হয়
চাঁপাইনবাবগঞ্জের বরেন্দা গ্রামে ১৯৫০ সালের তেভাগা আন্দোলনের স্মৃতি ফিরে এলো। বিপ্লবী ইলা মিত্রের নেতৃত্বে সংঘটিত ঐতিহাসিক আন্দোলনের এই অঞ্চলের কর্মীদের পরিবারকে প্রথমবারের মতো স্মরণ করা হয়েছে। বরেন্দা গ্রামের তেভাগা কর্মীদের মৃত্যু ও তাদের স্মৃতি বিস্মৃতিতে হারিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা।
🔴 মূল পয়েন্ট
- 📌 চাঁপাইনবাবগঞ্জের বরেন্দা গ্রামে ২৪ অক্টোবর বন্ধুসভার আয়োজনে তেভাগা আন্দোলনের স্মরণে আলোচনা ও সম্মাননা প্রদান করা হয়
- 📌 ১৯৫০ সালের তেভাগা আন্দোলনে সক্রিয় কর্মী সোমরা মুন্ডা পুলিশের নির্যাতনে রাজশাহী কারাগারে মৃত্যুবরণ করেন, কিন্তু পরিবারকে লাশ হস্তান্তর করা হয়নি
- 📌 বরেন্দা গ্রামের ৮৮ বছর বয়সী ঝড়ু মুন্ডা (১২ বছর বয়সে আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী) বলেন, পুলিশের গুলি ও ধরে নিয়ে যাওয়া সময়ের স্মৃতি এখনো জীবন্ত
- 📌 বরেন্দা গ্রামের কমিউনিস্ট পার্টির কর্মী নগেন মুন্ডা, বাবলা মুন্ডা, হাসরু ওঁরাও ও মাকুয়া ওঁরাও কারাবাসের পর ফিরে আসেন, কিন্তু তাদের মৃত্যুর খবর পরিবার জানতে পারেনি
- 📌 বরেন্দা গ্রামের তেভাগা কর্মীদের পরিবারের ২০ জনকে ফুল দিয়ে সম্মাননা প্রদান করা হয়, পাশাপাশি স্কুলগামী শিশুদের শিক্ষা উপকরণ উপহার দেওয়া হয়
📰 বিস্তারিত
১৯৫০ সালের তেভাগা আন্দোলনের সময় চাঁপাইনবাবগঞ্জের নেজামপুর ইউনিয়নের বরেন্দা গ্রামের কর্মীদের মধ্যে সোমরা মুন্ডা ছিলেন অন্যতম। পুলিশের নির্যাতনে তিনি মারাত্মক অসুস্থ অবস্থায় রাজশাহী কারাগারে মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু কারাগার কর্তৃপক্ষ লাশ পরিবারকে হস্তান্তর করেনি। ভয়ে পরিবারের লোকজনও খোঁজ নেয়নি। কারাভোগ শেষে অন্যরা বাড়ি ফিরে এলে জানা যায় সোমরা মুন্ডার মৃত্যুর নিশ্চিত খবর।
বরেন্দা গ্রামের তেভাগা আন্দোলনের এই কর্মীদের খবর নিতে এ পর্যন্ত কোনো লেখক বা গবেষক এ গ্রামে আসেননি। প্রথম আলোর ২৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ‘একটি ভালো কাজ’–এর অংশ হিসেবে ২৪ অক্টোবর বিকেলে বরেন্দা গ্রামে গিয়ে আন্দোলনের প্রয়াত কর্মীদের পরিবারের লোকজনকে সম্মাননা জানানো হয়। পাশাপাশি গ্রামের স্কুলগামী শিশুদের শিক্ষা উপকরণ উপহার দেওয়া হয়।
গ্রামের দুর্গামন্দিরে বন্ধুসভার সভাপতি মাসরুফা খাতুনের সভাপতিত্বে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। বক্তব্য দেন গ্রামের সবচেয়ে বয়স্ক ব্যক্তি ঝড়ু মুন্ডা (৮৮)। তিনি আন্দোলনের সময় ১২ বছরের বালক ছিলেন। স্মৃতি হাতড়ে তিনি বলেন, ‘যখন ধরপাকড় চলছিলো, তখন আমরা গরু চরাচ্ছিলাম। পুলিশেরা গুলিও ফুটাতো। গরু থুয়্যা আমরা দৌড় মারতাম।’
ঝড়ু মুন্ডা জানান, সোমরা মুন্ডা তাঁর ফুফা। রাজশাহী কারাগারে বন্দী অবস্থায় মৃত্যু হয় তাঁর। কিন্তু কারাগার কর্তৃপক্ষ পরিবারের কাছে লাশ ফিরিয়ে দেয়নি। মৃত্যুর বেশ কিছুদিন পর লোকমুখে সেই খবর পান। স্বজনেরা ভয়ে কেউ কারাগারে গিয়ে খোঁজ নিতে পারেননি।
বরেন্দা গ্রামের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য নগেন মুন্ডা, হাসরু ওঁরাও, লুগু ওঁরাও, বাবলা মুন্ডা ও মাকুয়া ওঁরাও দীর্ঘদিন কারাবাসের পর ফিরে আসেন। নগেন মুন্ডার বাড়িতে তল্লাশি করে পাওয়া যায় কমিউনিস্ট পার্টির চাঁদা আদায়ের রসিদ বই। তাঁর ওপরই নির্যাতন হয় বেশি। বাবলা মুন্ডা, হাসরু ওঁরাও ও মাকুয়া ওঁরাও বাবলা মুন্ডার স্বজনদের কেউ আর দেশে নেই।
"আমরা শোষণহীন সমাজতান্ত্রিক সমাজ গঠনের জন্য কমিউনিস্ট পার্টি করতাম।"
নগেন মুন্ডার ছেলে রতি মুন্ডা (৬৫) বলেন, ‘কারাগার থেকে বাড়ি ফিরে এসে বাবা বিয়ে করেন। বাবা গল্প করতেন আন্দোলনের সময়কার ঘটনার। আমিও বাবার আদর্শ ধারণ করে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের রাজনীতি করি, সমাজতন্ত্রের রাজনীতি করি। বাবা তো মেহনতি মানুষদের জিতিয়ে যেতে পারেননি। আমার জীবদ্দশায়ও জিত হবে বলে মনে হয় না। তবে আমার সন্তানদের সময় হবে বলে বিশ্বাস করি।’
গ্রামের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি জাতীয় আদিবাসী পরিষদের চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা সভাপতি টুনু পাহান বলেন, ‘গ্রামের হাতে গোনা কিছু বয়স্ক লোক ছাড়া এ কাহিনির কথা কেউ জানত না। বন্ধুসভার এমন আয়োজনের কারণে আজ গ্রামের অনেকেই জানল। তেভাগা আন্দোলনের প্রয়াত কর্মীদের পরিবারের সদস্যদের ফুল দিয়ে সম্মাননা জানানো হলো। শিশুদের শিক্ষা উপকরণ দিল। এই প্রথমবারের মতো গ্রামের তেভাগা আন্দোলনের কর্মীদের নিয়ে আলোচনা হলো। তাঁরা তো বিস্মৃতির গভীরে হারিয়ে যাওয়া মানুষ। ইলা মিত্রকে নিয়েও আলোচনা হলো। এই সবকিছুর জন্য বন্ধুসভাকে মন থেকে বিশেষ ধন্যবাদ জানাই।’
📊 তথ্যের সারসংক্ষেপ
- 📍 স্থান: বরেন্দা গ্রাম, চাঁপাইনবাবগঞ্জ
- 👥 খবরের মুখ্য ব্যক্তি: ঝড়ু মুন্ডা (৮৮), রতি মুন্ডা (৬৫), মাসরুফা খাতুন, টুনু পাহান
- 🔢 গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা: ২৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী, ২৪ অক্টোবর, ৮৮ বছর, ১২ বছর, ৬৫ বছর, ২০ জন
💬 মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!