📌 বৃষ্টিস্নাত এক সন্ধ্যায় চাকরি হারানোর চিঠি পেয়ে বিধ্বস্ত নীরা যখন নিজের জীবনের অন্ধকার মুহূর্তগুলোকে মোকাবিলা করে। বাবার মৃত্যু, বিবাহবিচ্ছেদ আর কর্মহীনতার যন্ত্রণা তাকে কীভাবে একাকীত্বের গহ্বরে ঠেলে দেয়, সেই গল্প তুলে ধরা হয়েছে এই প্রতিবেদনে
বৃষ্টির ঘন ধারা যেন শহরের ওপর একটা বিশাল কালো পর্দা টেনে দিয়েছে। সন্ধ্যা নামার আগেই অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে। সরু গলির নর্দমা উপচে পড়া পানিতে ভাসছে ভাঙা স্যান্ডেল, পলিথিন আর কালো পানি। বিদ্যুৎহীন ছয়তলা বাড়ির চারতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে নীরা নিচের দিকে তাকিয়ে ছিল। তার হাতে একটা সাদা খাম। খামের ভেতর মাত্র একটা পৃষ্ঠা লেখা: ‘দুঃখিত, এই মুহূর্তে আপনার আবেদনটি বিবেচনা করা সম্ভব হচ্ছে না।’
🔴 মূল পয়েন্ট
- 📌 গত আট মাসে নীরা সাতাশটি চাকরির আবেদন করেছে, যার মধ্যে পাঁচটি প্রতিষ্ঠান কোনো উত্তর দেয়নি
- 📌 দুইটি প্রতিষ্ঠান চিঠি পাঠিয়েছিল, যার শুরু ছিল একই শব্দে — ‘দুঃখিত’
- 📌 নীরার বাবা হাবিবুর রহমান ছিলেন স্কুল শিক্ষক, যিনি বিশ্বাস করতেন বই পড়লে মানুষ কয়েক শ বছর বাঁচে
- 📌 বাবার মৃত্যুর তিন মাস পর জমি বিক্রি করতে হয়, ছয় মাস পর বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে
- 📌 নীরা একবার পেয়ারা বিক্রেতার কথায় আবেগাপ্লুত হয়ে কেঁদে ফেলেছিল
📰 বিস্তারিত
বৃষ্টির ঘন ধারায় শহরের ওপর যেন একটা কালো চাদর বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। সন্ধ্যা নামার আগেই অন্ধকার ঘন হয়ে আসছে। সরু গলির নর্দমা উপচে পড়া পানিতে ভাসছে ভাঙা স্যান্ডেল, পলিথিন আর কালো পানি। বিদ্যুৎহীন ছয়তলা বাড়ির চারতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে নীরা নিচের দিকে তাকিয়ে ছিল। তার হাতে একটা সাদা খাম। খামের ভেতর মাত্র একটা পৃষ্ঠা লেখা: ‘দুঃখিত, এই মুহূর্তে আপনার আবেদনটি বিবেচনা করা সম্ভব হচ্ছে না।’
নীরা অনেকক্ষণ ধরে শব্দটা পড়ল। ‘দুঃখিত।’ শব্দটা তার কাছে আর দুঃখী মনে হলো না। বরং নিষ্ঠুর। অনেকটা হাসপাতালের চিকিৎসকের মতো, যারা শান্ত মুখে বলে, ‘আমরা চেষ্টা করেছি।’ গত আট মাসে সাতাশটা চাকরির আবেদন করেছে নীরা। এগারোটা ইন্টারভিউ। পাঁচটা জায়গা কোনো উত্তরই দেয়নি। চারটা বলেছিল, ‘আমরা আপনাকে জানাব।’ কেউ জানায়নি। দুটো প্রতিষ্ঠান চিঠি পাঠিয়েছে। দুটোর শুরু একই শব্দে। ‘দুঃখিত।’
নীরা খামটা ভাঁজ করে গ্রিলের ওপর রাখল। ভেতর থেকে মা ডাকলেন, ‘নীরা?’ সে উত্তর দিল না। ‘মোমবাতিটা কোথায় রেখেছিস রে?’ ‘ড্রয়ারে।’ ‘কোন ড্রয়ার?’ নীরা বিরক্তিতে চোখ বন্ধ করল। আজ তার কারও সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। ‘টিভির নিচেরটা।’ কিছুক্ষণ পর আবার মায়ের গলা। ‘পাচ্ছি না তো।’ নীরা ধীরে ধীরে ভেতরে গেল। অন্ধকার ঘরে হাতড়ে মোমবাতি বের করল। দেশলাই ঘষতেই ছোট্ট একটা হলুদ আগুন জ্বলে উঠল। তারপর মোমবাতি। শিখাটা স্থির হতেই মায়ের মুখ দেখা গেল। নীরা থমকে গেল। মাত্র দুই বছরে মানুষ এত বুড়ো হয়ে যায়?
বাবা হাবিবুর রহমান ছিলেন স্কুলের বাংলা শিক্ষক। তিনি বিশ্বাস করতেন, পৃথিবীর সব সমস্যার উত্তর কোনো না কোনো কবিতায় পাওয়া যায়। বেতন পাওয়ার তিন দিনের মধ্যে সংসারে টাকা থাকুক আর না থাকুক, একটা বই কিনে বাড়িতে ফিরতেন। মা খুব রাগ করতেন। ‘চাল নাই ঘরে, তুমি বই কিনে আনছ?’ বাবা হাসতেন। ‘চাল খেলে মানুষ কয়েক ঘণ্টা বাঁচে। বই পড়লে কয়েক শ বছর।’ মা বিরক্ত হয়ে রান্নাঘরে চলে যেতেন। বাবা তখন নীরার দিকে চোখ টিপতেন। নীরা হেসে ফেলত। তখন জীবনটা খুব সহজ ছিল। যেকোনো বিপদে বাবা ছিলেন। তারপর একদিন সকালে বাবা স্কুলে যাওয়ার জন্য শার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতে হঠাৎ বসে পড়লেন। বললেন, ‘নীরা, একগ্লাস পানি দে তো।’ নীরা পানি এনে দেখল, বাবা মেঝেতে শুয়ে আছেন। তারপর সব খুব দ্রুত ঘটেছিল। অ্যাম্বুলেন্স। হাসপাতাল। আইসিইউ। দরজার ওপর লাল বাতি। মায়ের হাতে তসবিহ। ডাক্তারের নিচু গলা। ‘আমরা চেষ্টা করেছি।’ তিনটা শব্দ। মাত্র তিনটা। কিন্তু ওই তিনটা শব্দের একপাশে ছিল তাদের পুরোনো জীবন। অন্যপাশে ছিল সম্পূর্ণ নতুন এক জীবন।
“চাল খেলে মানুষ কয়েক ঘণ্টা বাঁচে। বই পড়লে কয়েক শ বছর।”
বাবার মৃত্যুর তিন মাস পর গ্রামের জমি বিক্রি করতে হলো। ছয় মাস পর ভেঙে গেল নীরার বিয়ে। সজীবের সাথে দীর্ঘদিন ওর প্রেম ছিল। ওর ধারণা ছিল, সজীবও ওকে ভালোবাসে। কিন্তু ছেলেটা একদিন ফোনে বলেছিল, ‘তুমি বুঝতেই পারছ, পরিস্থিতি একটু complicated।’ ‘কোন পরিস্থিতি?’ ওপাশে দীর্ঘ নীরবতা। তারপর, ‘তোমার বাবাও নেই। তোমার চাকরিটাও এখনো হয়নি…’ নীরা ফোন কেটে দিয়েছিল। সেদিন রাতে সে একদম কাঁদেনি। শুধু বাবার আলমারির সামনে বসে ছিল। মানুষ খুব বড় আঘাতে অনেক সময় কাঁদতে পারে না। খুব ছোট কোনো ঘটনায় হঠাৎ ভেঙে পড়ে।
বাবার মৃত্যুর এক বছর পর একদিন বাজারে পেয়ারা কিনতে গিয়ে সেটা হয়েছিল। এক বৃদ্ধ পেয়ারা বিক্রেতাকে এক ক্রেতা বলেছিল, ‘এত দাম? পেয়ারা, নাকি সোনা?’ বৃদ্ধ হেসে বলেছিল, ‘মা, আমার পেয়ারা খাইলে মন ভালো হয়ে যাবে।’ নীরা চমকে তাকিয়েছিল। বৃদ্ধের সাথে বাবার চেহারার কোনো মিল নেই। অথচ কণ্ঠস্বরে কোথায় যেন মিল আছে। হুবহু। সে বাজারের মাঝখানে দাঁড়িয়ে কেঁদে ফেলেছিল। লোকজন তাকিয়ে ছিল। সে নিজেকে থামাতে পারেনি।
📊 তথ্যের সারসংক্ষেপ
- 📍 স্থান: শহরের সরু গলি ও বাড়ির বারান্দা
- 👥 খবরের মুখ্য ব্যক্তি: নীরা
- 🔢 গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা: সাতাশটি চাকরির আবেদন, দুই বছরের ব্যবধানে মায়ের বয়স বৃদ্ধি
💬 মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!