📌 উনিশ শতকে গণিত পুরস্কার ছিল বিজ্ঞানীদের জন্য বিশাল প্রণোদনা। ফ্রান্সের প্যারিসে ঘোষিত পুরস্কারগুলোতে অংশ নিয়েছিলেন সোফি জার্মেইনের মতো অসামান্য ব্যক্তিত্বরা। তাঁর জীবনের ঘটনাগুলো গণিত ইতিহাসের রাজনীতির এক চমকপ্রদ দিক উন্মোচন করে
উনিশ শতকের শুরুতে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস গণিত ও বিজ্ঞানের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে ওঠে। সেই সময়ে গণিতের কঠিন সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য ঘোষণা করা হয় বেশ কিছু পুরস্কার। ১৮০৩ সালে প্যারিসের পুনর্গঠিত বিজ্ঞান একাডেমি দুটি গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কারের ঘোষণা দেয়। এর মধ্যে ছিল গ্র্যান্ড প্রি ডেস সায়েন্সেস ম্যাথমেটিকস এবং গ্র্যান্ড প্রি ডেস সায়েন্সেস ফিজিকস। প্রতিটি পুরস্কারের অর্থমূল্য ছিল তিন হাজার ফ্রান্সের ফ্র্যাঙ্ক। উল্লেখ্য, তৎকালীন একজন অধ্যাপকের বার্ষিক বেতন ছিল প্রায় চার হাজার ফ্র্যাঙ্ক। ফলে এই পুরস্কার বিজ্ঞানীদের জন্য ছিল বিরাট প্রণোদনা। পুরস্কার প্রদানের নিয়ম ছিল গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানে এক বছর পর পর। তবে মাঝেমধ্যে অনিয়মিত প্রতিযোগিতাও আয়োজন করা হতো।
🔴 মূল পয়েন্ট
- 📌 ১৮০৩ সালে প্যারিস বিজ্ঞান একাডেমি দুটি নতুন গণিত পুরস্কার ঘোষণা করে, যার অর্থমূল্য ছিল তিন হাজার ফ্র্যাঙ্ক
- 📌 ১৮০৯ সালে নেপোলিয়ন বোনাপার্ট ‘স্থিতিস্থাপক পাতের কম্পন’ বিষয়ে একটি প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন
- 📌 সোফি জার্মেইন নামে এক অপরিচিত নারী গণিতবিদ ১৮১১ সালের প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে পরবর্তীতে ১৮১৫ সালে পুরস্কার জয় করেন
- 📌 সিমিওন ডেনিস পয়সন নিজেই বিচারক থাকা অবস্থায় প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ায় ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন
- 📌 ফার্মার শেষ উপপাদ্য নিয়ে প্রতিযোগিতায় কেউ অংশ না নেওয়ায় চার বছর পর প্রশ্নটি প্রত্যাহার করা হয়
📰 বিস্তারিত
১৮০৩ সালে ফ্রান্সের প্যারিসে পুনর্গঠিত বিজ্ঞান একাডেমি দুটি নতুন পুরস্কারের ঘোষণা দেয়। একটি ছিল গ্র্যান্ড প্রি ডেস সায়েন্সেস ম্যাথমেটিকস এবং অন্যটি গ্র্যান্ড প্রি ডেস সায়েন্সেস ফিজিকস। প্রতিটি পুরস্কারের অর্থমূল্য ছিল তিন হাজার ফ্রান্সের ফ্র্যাঙ্ক। তৎকালীন একজন অধ্যাপকের বার্ষিক বেতন ছিল প্রায় চার হাজার ফ্র্যাঙ্ক। ফলে বিজ্ঞানীদের জন্য এটি ছিল বিরাট প্রণোদনা। পুরস্কার প্রদানের নিয়ম ছিল গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানে এক বছর পর পর। তবে মাঝেমধ্যে অনিয়মিত প্রতিযোগিতাও আয়োজন করা হতো।
১৮০৯ সালে ফ্রান্সের সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্ট ‘স্থিতিস্থাপক পাতের কম্পন’ বিষয়ে একটি প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন। এই বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করেছিলেন জার্মান পদার্থবিজ্ঞানী আর্নস্ট ক্লাডনি। তাঁর পরীক্ষাগুলো দেখার পর নেপোলিয়নের মাথায় এই ধারণা আসে। প্রতিযোগিতার বিচারকদের প্রধান ছিলেন বিখ্যাত গণিতবিদ পিয়ের-সিমোঁ ল্যাপলাস। তিনি তাঁর প্রিয় ছাত্র সিমিওন ডেনিস পয়সনকে সামনে এগিয়ে দিতে চেয়েছিলেন।
১৮১১ সালের জন্য প্রতিযোগিতা ঘোষণা করা হলে মাত্র একটি প্রবন্ধ জমা পড়েছিল। অবাক করা বিষয় হলো, সেই প্রবন্ধটি ছিল সোফি জার্মেইনের। তিনি ছিলেন একজন অপরিচিত নারী গণিতবিদ। বিচারকেরা তাঁর সমাধানে কিছু ঘাটতি খুঁজে পান। ফলে প্রতিযোগিতার সময়সীমা বাড়িয়ে দেওয়া হয় ১৮১৩ সালের অক্টোবর পর্যন্ত।
সোফি তাঁর কাজ আরও নিখুঁত করতে শুরু করেন। তিনি নিয়মিত বিচারক আদ্রিয়েন-মারি লেজেন্ডারের সঙ্গে চিঠিপত্র আদান-প্রদান শুরু করেন। লেজেন্ডার তাঁর কাজে কিছুটা হতাশ হলেও, সোফি শেষ পর্যন্ত সম্মানজনক স্বীকৃতি পান। সময়সীমা আরও দুই বছর বাড়িয়ে দেওয়া হয় ১৮১৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত। ঠিক তখনই সিমিওন ডেনিস পয়সন নিজের প্রবন্ধ জমা দেন। সমস্যা হলো, পয়সন ছিলেন সেই প্রতিযোগিতার একজন বিচারক। একজন বিচারক হয়ে নিজেই প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ায় ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি। লেজেন্ডার এই কাজের বিরোধিতা করেন।
পয়সনের লেখাটি ইনস্টিটিউট ডি ফ্রান্সে পড়া হয় এবং প্রকাশিত হয়। বলা হয়েছিল, তাঁর লেখাটি অন্য প্রতিযোগীদের সাহায্য করবে। আসলে পয়সনের উদ্দেশ্য ছিল তাঁর লেখার মাধ্যমে সমস্যাটিকে প্রতিযোগিতা থেকে সরিয়ে দেওয়া, যাতে তিনি ল্যাপলাসের নজরে আরও বড় হতে পারেন। তবে তাঁর এই চালাকি ব্যাপক কেলেঙ্কারির জন্ম দেয়। শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি প্রতিযোগিতায় রাখা হয়। সম্ভবত পর্দার আড়ালে এমন একটি চুক্তি হয়েছিল যে, সোফি যদি তাঁর কাজ আরও উন্নত করতে পারেন, তবে তাঁকেই পুরস্কার দেওয়া হবে।
শেষ পর্যন্ত সোফি গাণিতিকভাবে সমস্যাটির সমাধান না করতে পারলেও পরীক্ষামূলকভাবে তাঁর কাজ উন্নত করে দেখান। ফলে ১৮১৫ সালে তিনিই পুরস্কারটি জয় করেন। সোফি জার্মেইনের এই গল্প প্রমাণ করে, সেই সময়ে প্যারিসের অভিজাত বিজ্ঞানী মহলে পুরস্কার প্রদানের ক্ষেত্রে কতটা রাজনীতি চলত। সম্ভবত এই অভিজ্ঞতার কারণেই ফার্মার শেষ উপপাদ্য নিয়ে প্রতিযোগিতা ঘোষণা করা হলে সোফি আর অংশ নেননি। এমনকি কেউই অংশ নেননি। চার বছর পর প্রশ্নটি প্রত্যাহার করা হয়।
"সোফি জার্মেইনের কাজ অয়লারের পরে এবং জার্মান বিজ্ঞানী আর্নস্ট এডুয়ার্ড কুমারের আগের এক শতাব্দীর মধ্যে সেরা কাজ হিসেবে স্বীকৃত।"
১৮৩০ সালে লেজেন্ডার তাঁর থিওরি ডেস নমব্রেস বইয়ে সোফির কাজগুলো প্রকাশ করেন। ফলে রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে ওঠেন সোফি। এছাড়া ১৮১৫ সালের গণিত পুরস্কারের আরেকটি ঘটনা ছিল চমকপ্রদ। তরঙ্গের বিস্তার নিয়ে একটি প্রশ্নের উত্তরে অগাস্টিন-লুই কশি একটি চমৎকার প্রবন্ধ লেখেন। সেখানে তিনি একটি ফাংশন এবং তার ফুরিয়ার ট্রান্সফর্মের মধ্যকার সম্পর্ক আবিষ্কার করেন। যদিও তিনি জোসেফ ফুরিয়ারকে তাঁর কাজের স্বীকৃতি দিয়েছিলেন।
📊 তথ্যের সারসংক্ষেপ
- 📍 স্থান: প্যারিস, ফ্রান্স
- 👥 খবরের মুখ্য ব্যক্তি: সোফি জার্মেইন, সিমিওন ডেনিস পয়সন, পিয়ের-সিমোঁ ল্যাপলাস
- 🔢 গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা: তিন হাজার ফ্র্যাঙ্ক (পুরস্কারের অর্থমূল্য), চার হাজার ফ্র্যাঙ্ক (অধ্যাপকের বার্ষিক বেতন)
💬 মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!