📋 জীবনী
নুসরাত তাবাসসুম জ্যোতি একজন বাংলাদেশী জাতীয় সংসদ সদস্য, যিনি জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) পক্ষে জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের প্রতিনিধিত্ব করেন। তিনি একজন ছাত্রনেত্রী, রাজনৈতিক কর্মী এবং মানবাধিকার রক্ষাকর্মী। তিনি জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপির) যুগ্ম আহ্বায়ক ও দলটির নারী শাখা জাতীয় নারী শক্তির প্রধান সংগঠক। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ৬জন প্রধান সমন্বয়কের একজন হিসেবে তিনি পরিচিতি লাভ করেন। ওই আন্দোলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেন এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকার পতন ঘটে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী হিসেবে নুসরাত অভ্যুত্থানের সময় বিশেষত নারী শিক্ষার্থীদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রে সামনের সারির নেতৃত্ব দেন। ২০২৪ সালের ২৮ জুলাই তাকে পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) কর্তৃক আটক করা হয়, এবং আটক হওয়া ছয়জন নেতার মধ্যে তিনি একমাত্র নারী সমন্বয়ক ছিলেন। আটক অবস্থায় তাকে আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা দিতে বাধ্য করা হলেও ১ আগস্ট ২০২৪ তিনি মুক্তি পান এবং সাথে সাথেই আন্দোলনে পুনরায় যোগ দেন।
প্রাথমিক ও শিক্ষাজীবন
নুসরাত তাবাসসুমের জন্ম আনুমানিক ২০০১ সালে বাংলাদেশের কুষ্টিয়া জেলার দৌলতপুর উপজেলার মথুরাপুর ইউনিয়নের বাগোয়ান গ্রামে। তার বাবা-মা উভয়েই শিক্ষক; তার বাবা একজন স্কুলশিক্ষক হিসেবে কর্মরত। তিনি একটি রাজনৈতিকভাবে বৈচিত্র্যময় পরিবারে বেড়ে ওঠেন, যেখানে তার বিস্তৃত পরিবারে চরম বাম থেকে চরম ডান পর্যন্ত বিভিন্ন মতাদর্শের রাজনীতিতে সম্পৃক্ততা ছিল। তিনি বাগোয়ান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা এবং বাগোয়ান কে.সি.ভি.এন. মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। এরপর উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার জন্য তিনি ড. ফজলুল হক গার্লস ডিগ্রি কলেজে অধ্যয়ন করেন। শিক্ষাজীবনে তিনি বিতর্ক, হস্তশিল্প, আবৃত্তি ও নাটকে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতেন। ২০১৮ সালের জুলাইয়ে নুসরাত বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি কোচিং করার জন্য ঢাকায় আসেন এবং ফার্মগেট এলাকায় অবস্থান করেন। এই সময়টি ২০১৮-র নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের সঙ্গে মিলে যায়, যা তার রাজনৈতিক চেতনা গঠনে গভীর প্রভাব ফেলে। একই বছরের শেষদিকে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে (২০১৮–১৯ শিক্ষাবর্ষ) অধ্যয়ন শুরু করেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তিনি শামসুন্নাহার হলে অবস্থান করতেন।
রাজনৈতিক সক্রিয়তা
নুসরাতের প্রথম সরাসরি আন্দোলনে অংশগ্রহণ শুরু হয় ২০১৮ সালের সড়ক নিরাপত্তা আন্দোলনের সময়, যাকে তিনি বাংলাদেশের জেনারেশন-জেডের রাজনৈতিক চেতনার 'সংজ্ঞায়িত মুহূর্ত' হিসেবে বর্ণনা করেছেন। কলেজ শিক্ষার্থী হিসেবে তিনি জিগাতলায় আন্দোলনে অংশ নেন, যেখানে তিনি বাংলাদেশ ছাত্রলীগ (বিসিএল) কর্মী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আন্দোলনকারীদের ওপর নির্মম হামলা প্রত্যক্ষ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তিনি ক্যাম্পাসভিত্তিক বিভিন্ন আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন, যার মধ্যে সাত কলেজের অধিভুক্তির বিরুদ্ধে আন্দোলন উল্লেখযোগ্য। ২০১৯ সালে বুয়েটে আবরার ফাহাদ হত্যার পরের আন্দোলনগুলোর অন্যতম প্রধান সংগঠকদের একজনও ছিলেন তিনি। ২০২১ সালের মার্চে তিনি ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনেও অংশগ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রজীবনের পুরো সময়জুড়ে তিনি সরকারপন্থী ছাত্রসংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের অন্যায় কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। শামসুন্নাহার হলে ছাত্রলীগ কর্মীদের দ্বারা তিনি নির্যাতনের শিকার হন।
২০২১ সালের ১৭ মার্চ নুসরাত বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাংস্কৃতিক সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে তিনি ছয় মাসের জন্য একই শাখার যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৩ সালে তিনি সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচন করেন, তবে অল্প ব্যবধানে পরাজিত হয়ে সহকারী সাধারণ সম্পাদক হন। তবে সংগঠনটির কার্যক্রম নিয়ে তিনি হতাশ হয়ে পড়েন এবং তার মতে নেতা নুরুল হক নুর ক্যাম্পাসে ছাত্রকল্যাণের মূল লক্ষ্য থেকে সরে যাচ্ছিলেন। এরপর আসিফ মাহমুদসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার পুরো কমিটি নিয়ে তিনি ২০২৩ সালে বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদ থেকে পদত্যাগ করেন।
ছাত্র অধিকার পরিষদ থেকে পদত্যাগের পর নুসরাত গণতান্ত্রিক ছাত্রশক্তিতে যোগ দেন এবং প্রতিষ্ঠাকালীন যুগ্ম সংগঠক সম্পাদকদের একজন হন। ২০২৩ সালের ৪ অক্টোবর আখতার হোসেনের নেতৃত্বে এই সংগঠনটি গঠিত হয়, যেখানে নাহিদ ইসলাম সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে জুলাই অভ্যুত্থানের সমন্বয়কারী হিসেবে যেসব নেতারা ভূমিকা রাখেন, তাদের অনেকের জন্যই গণতান্ত্রিক ছাত্রশক্তি একটি সাংগঠনিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।
জাতীয় নাগরিক পার্টি