📌 ঝিকরগাছা উপজেলার মদনপুর সম্মিলনী ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক সফিয়ার রহমান এক যুগের বেশি সময় ধরে নিজস্ব উদ্যোগে সড়ক, রেললাইন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশে ২০ হাজারাধিক গাছ লাগিয়েছেন। তিনি পরিচিত ‘গাছপাগল শিক্ষক’ হিসেবে। বর্তমান বছরে কলেজ থেকে অবসর নেবার আগে তিনি পরিবেশ রক্ষায় আরও বড় উদ্যোগ নিচ্ছেন
ঝিকরগাছা উপজেলার মদনপুর গ্রামে এক যুগের বেশি সময় ধরে চলছে ‘গাছপাগল শিক্ষক’ সফিয়ার রহমানের সবুজ বিপ্লব। সড়ক, রেললাইন, নদীতীর ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশে তিনি নিজস্ব উদ্যোগে অসংখ্য গাছ লাগিয়ে পরিবেশ রক্ষায় অবদান রাখছেন। বর্তমান বছরে মদনপুর সম্মিলনী ডিগ্রি কলেজ থেকে অবসর নেবার আগে তিনি আরও বড় উদ্যোগ নিচ্ছেন।
🔴 মূল পয়েন্ট
- 📌 ২৫ কিলোমিটার দূরে মদনপুর গ্রামে ‘গাছপাগল শিক্ষক’ সফিয়ার রহমানের ২০ হাজারাধিক গাছের সবুজ বিপ্লব
- 📌 ১৯৯১ সাল থেকে শুরু করে বর্তমান পর্যন্ত নিজস্ব খরচে গাছ লাগানোর কাজে ৩০ বছর অতিবাহিত
- 📌 ঝিকরগাছা-রাজগঞ্জ সড়কে ১০ হাজার তালবীজ রোপণ, এখনো ১ হাজার গাছ বেঁচে আছে
- 📌 মনিরামপুরের খর্দ গ্রামের কৃষক রুহুল গাজীর উদাহরণে অনুপ্রাণিত হয়ে খেজুর ও তালগাছের বিচি রোপণ শুরু
- 📌 বেনাপোল থেকে বাগেরহাটের ট্রেনে রেললাইনের পাশে ১ লাখ খেজুরবীজ ছড়িয়ে দিয়েছেন
📰 বিস্তারিত
যশোর শহর থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে ঝিকরগাছা উপজেলার মদনপুর গ্রামের বটতলা মোড় থেকে দক্ষিণে পিচঢালা পথে এগিয়ে গেলে দেখা যায় মাঠের পর মাঠ। এই মাঠের পাশে যে পথ, সেটি রাজগঞ্জ বাজারে মিশেছে। এই সড়কের দুই পাশে সারি সারি ছোট-বড় তালগাছের সাজসজ্জা সফিয়ার রহমানের দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের ফল। তিনি মদনপুর সম্মিলনী ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক। নিজস্ব খরচে এক যুগের বেশি সময় ধরে তিনি গাছ লাগিয়ে চলেছেন।
সফিয়ার রহমানের সবুজ বিপ্লবের শুরু নব্বইয়ের দশকে। ১৯৯১ সালে ঝিকরগাছার পারবাজার মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন তিনি। সেই সময় সরকার দেশব্যাপী বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি শুরু করে। ওই কর্মসূচির অংশ হিসেবে তিনি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে বারবাকপুর বিলপাড়ের রাস্তার ধারে অসংখ্য শিশুগাছ ও জামগাছের চারা রোপণ করেন। সময়ের বিবর্তনে অনেক গাছ হারিয়ে গেলেও কিছু জামগাছ এখনো দাঁড়িয়ে আছে সেই উদ্যোগের সাক্ষী হিসেবে।
১৯৯৬ সালে মদনপুর সম্মিলনী ডিগ্রি কলেজে যোগ দেন সফিয়ার রহমান। এরপর তিনি নিজ এলাকা ও আশপাশের জনপদে গাছ লাগানোর কাজ আরও বিস্তৃত করেন। ২০১৪ সালের দিকে মনিরামপুরের খর্দ গ্রামের কৃষক রুহুল গাজীর সঙ্গে পরিচয় ঘটে। রুহুল গাজী কপোতাক্ষ নদের তীরে লাঙল চাষ শেষে তালবীজ রোপণ করতেন। এই উদাহরণ দেখে সফিয়ার রহমান অনুপ্রাণিত হন। তিনি ভাবেন, একজন কৃষক যদি প্রকৃতির জন্য এতটা দায়িত্বশীল হতে পারেন, তবে একজন শিক্ষক হিসেবে তার ভূমিকা আরও বড় হতে পারে। এরপর তিনি তালগাছ ও খেজুরগাছের বিচি রোপণের বিশেষ উদ্যোগ নেন।
সফিয়ার রহমানের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালের দিকে ঝিকরগাছা-রাজগঞ্জ সড়কে তিনি আম, জাম, কাঁঠালসহ প্রায় ১০ হাজার তালবীজ রোপণ করেন। এগুলোর মধ্যে প্রায় এক হাজার গাছ এখনো বেঁচে আছে। মনিরামপুরের খড়িঞ্চা-রাজগঞ্জ সড়কে দুই বছরে প্রায় দুই হাজার খেজুরগাছ রোপণ করেছেন তিনি। এ ছাড়া শৈলি, বসন্তপুর ও তেঁতুলিয়া সড়কে প্রায় ১০ হাজার দেবদারুর বীজ ছড়িয়ে দিয়েছেন। পুলেরহাট-রাজগঞ্জ সড়কে প্রশাসনের উদ্যোগে রোপণ করা গাছ নষ্ট হয়ে গেলে বা ফাঁকা জায়গা তৈরি হলে তিনি আবার নতুন করে সেখানে তালবীজ রোপণ করেন।
শুধু সড়কেই নয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেও সবুজে ঘিরে রাখতে তিনি কাজ করে চলেছেন। মদনপুর সম্মিলনী ডিগ্রি কলেজ এলাকায় তিনি ৩০-৩৫টি তালগাছ, বটবৃক্ষসহ নানা প্রজাতির গাছ লাগিয়েছেন। কলেজ ক্যাম্পাসে লাগানো একটি বটগাছের নাম দিয়েছেন ‘জ্ঞানবৃক্ষ’। যশোর টিচার্স ট্রেনিং কলেজে বিএড অধ্যয়নকালে তিনি নেতৃত্বে ২০টি পেয়ারাগাছ রোপণ করেছিলেন। সম্প্রতি মদনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে ৩০ কেজি খেজুরের বিচি সংগ্রহ করে বসন্তপুর, দিঘিরপাড়, তেঁতুলিয়া মোড় হয়ে খাটুরা বাজার পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকায় রোপণ করেছেন।
সফিয়ার রহমানের সবচেয়ে বড় উদ্যোগ ছিল বেনাপোল থেকে বাগেরহাটের মোংলা গামী ট্রেনে চড়ে রেললাইনের দুপাশে ছিটিয়ে দিয়েছেন কয়েক লাখ খেজুরের বিচি। তিনি বলেন, ‘আমার দেখাদেখি একজন মানুষও যদি একটি গাছ রোপণ করেন এবং সেটির যত্ন নেন, তাহলেই আমার এই দীর্ঘদিনের পরিশ্রম সার্থক হবে।’
"একজন ব্যতিক্রম শিক্ষক সফিয়ার রহমান। তিনি আনন্দের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করেন। কখনো কখনো তাঁর রোপণ করা গাছের নিচেও পাঠদান করেন তিনি। পরিবেশ রক্ষায় সফিয়ারের মতো অন্যদেরও এগিয়ে আসা উচিত।"
— মদনপুর সম্মিলনী ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ মো. সফিকুল ইসলাম
📊 তথ্যের সারসংক্ষেপ
- 📍 স্থান: ঝিকরগাছা উপজেলা, মদনপুর গ্রাম, যশোর
- 👥 খবরের মুখ্য ব্যক্তি: সফিয়ার রহমান (সহকারী অধ্যাপক, মদনপুর সম্মিলনী ডিগ্রি কলেজ)
- 🔢 গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা: ২৫ কিলোমিটার দূরে, ২০ হাজারাধিক গাছ, ১০ হাজার তালবীজ, ১ হাজার বেঁচে থাকা গাছ, ৩০ বছর পরিশ্রম
💬 মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!