📌 পা হারিয়ে জীবনের এক বাঁকে ফেলা ঠাকুরগাঁওয়ের সুজন এখন পীরগঞ্জ রেলস্টেশনের স্টেশনমাস্টার। কিশোর বয়সেই দুর্ঘটনায় পা হারানোর পরেও তিনি কৃত্রিম পায়ে পড়াশোনা, চাকরি ও দায়িত্বের পথে অগ্রসর হন
পা হারিয়ে জীবনের এক বাঁকে ফেলা ঠাকুরগাঁও জেলার সুজন এখন ঠাকুরগাঁও পীরগঞ্জ রেলস্টেশনের স্টেশনমাস্টার। কিশোর বয়সেই দুর্ঘটনায় পা হারানোর পরেও তিনি কৃত্রিম পায়ে পড়াশোনা, চাকরি ও দায়িত্বের পথে অগ্রসর হন। জীবনের রেললাইন যে সব সময় সোজা পথে চলতে পারে না, তা তিনি বুঝেছিলেন সেই কিশোর বয়সেই।
🔴 মূল পয়েন্ট
- 📌 **২০০৩ সালে দুর্ঘটনায় পা হারানোর পরেও** কৃত্রিম পায়ে পড়াশোনা, চাকরি ও দায়িত্বের পথে অগ্রসর হন সুজন।
- 📌 **হরিপুরের কাঁঠালডাঙ্গী স্কুলের ছাত্র** সুজন (সোহরাব হোসেন সুজন) পাওয়ার টিলার চালানোর সময় পা হারান।
- 📌 **২০০৮ সালে জিপিএ ৪.৬০ ও ২০১০ সালে জিপিএ ৪.৯০** নিয়ে এইচএসসি পাস করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন।
- 📌 **২০১৯ সালে সহকারী স্টেশনমাস্টার (এএসএম) হিসেবে** বাংলাদেশ রেলয়ে যোগদান করেন।
- 📌 **২০২৩ সালে পূর্ণাঙ্গ স্টেশনমাস্টার** হিসেবে দায়িত্ব পান পীরগঞ্জ স্টেশনে।
- 📌 **কোনো বিশেষ সুবিধা চান না** — শারীরিক সীমাবদ্ধতার জন্য রেলওয়ে থেকে বাড়তি সুবিধার প্রত্যাশা করেন না।
📰 বিস্তারিত
২০০৩ সালের এক দুর্ঘটনা জীবন পরিবর্তন করে দিলো ঠাকুরগাঁও জেলার হরিপুর উপজেলার মাগুরা গ্রামের সুজনকে। তখন তিনি কাঁঠালডাঙ্গী দ্বিমুখী উচ্চবিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। বড় আব্বার সঙ্গে মাঠে গিয়ে আলুর জমি চাষ দেখার সময় পাওয়ার টিলার চালানোর ইচ্ছা জাগে তার মনে। কিন্তু অনভিজ্ঞ হাতে মোড় ঘোরাতে গিয়ে ঘটে গেল দুর্ঘটনা। পাশের পুকুরে উল্টে গেল গাড়ি, এবং সুজনের বাঁ পা স্লিপ কেটে সোজা ঢুকে গেল টিলারের ফালসেটে। রক্তনালি পুরোপুরি ছিঁড়ে যাওয়ায় চিকিৎসকরা বাঁ পা কেটে ফেলতে বাধ্য হন।
হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে তিনি নিজেকে বোঝালেন যে, লজ্জা ভেঙে আবার পথে নামতে হবে। ঢাকায় কর্মরত বোন নাসিমা ও দুলাভাই হাবিবের সহায়তায় পায়ে প্লাস্টিক সার্জারি করে কৃত্রিম পা লাগানো হলো। স্কুলে যেতে শুরু করলেন, কিন্তু ক্লাসে যেতেন না শুধু পরীক্ষা দিতেন। স্থানীয় কোচিংয়ের মডেল টেস্টে প্রথম স্থান অধিকার করে চমকে দিলেন সবাইকে। ২০০৮ সালে এসএসসিতে মানবিক বিভাগ থেকে পেলেন জিপিএ ৪.৬০। এরপর কাঁঠালডাঙ্গী কেবি ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসিতে অর্জন করলেন ৪.৯০।
বাবা চাইতেন সুজন বাড়ির কাছেই থাকুক, কিন্তু তিনি স্বপ্ন দেখতেন আরও বড়। বাবার আপত্তি জয় করে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিলেন এবং চান্স পেয়ে গেলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে। পড়াশোনার খরচ জোগাতে বাবা জমি বন্ধক রেখে ধারদেনা করে টাকা দিতেন। রাজশাহী থেকে মাস্টার্স শেষ করে সুজন চলে আসেন দিনাজপুরে। কোনো কোচিং সেন্টারে না গিয়ে মেসে বসে শুরু হয় সরকারি চাকরির প্রস্তুতি। নূর ইসলাম নামের এক স্কুলবন্ধুর সহযোগিতায় দিনাজপুর সরকারি কলেজের শিক্ষার্থীদের নিয়ে গড়ে তোলেন ৫৫-৬০ জনের একটি সেলফ-স্টাডি গ্রুপ। রাত ৩টা-৪টা, কখনোবা ফজরের আজান পর্যন্ত টেবিল-চেয়ারেই কেটে যেত তাঁর সময়। বিসিএস ও চাকরির বইয়ের আদ্যোপান্ত মুখস্থ করার জন্য মেসের সহপাঠীরা তাঁকে ডাকতেন ‘বস’ বলে।
কঠোর পরিশ্রমের ফল মিলতে দেরি হয়নি। প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষসহ একাধিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন তিনি। ২০১৯ সালের মে মাসে সহকারী স্টেশনমাস্টার (এএসএম) হিসেবে যোগ দেন বাংলাদেশ রেলয়ে। শুরুর দিকে কেউ কেউ তাঁর শারীরিক সক্ষমতা নিয়ে সন্দিহান হলেও কাজে কোনো ছাড় দেননি সুজন। দিনরাত দায়িত্বের প্রতি নিষ্ঠা আর একাগ্রতা দেখে যোগদানের মাত্র পাঁচ-ছয় মাসের মাথায় ব্যস্ত পীরগঞ্জ স্টেশনের দায়িত্ব তাঁর ওপর ন্যস্ত করে কর্তৃপক্ষ। চার বছর পর ২০২৩ সালে পান পদোন্নতি; পূর্ণাঙ্গ স্টেশনমাস্টার হিসেবে দায়িত্ব নেন একই স্টেশনের। এখন সেই সুজন সময়মতো ট্রেনস্টেশন পরিচালনা, শত শত যাত্রীর নিরাপত্তা আর টিকিট ও ক্যাশের সঠিক হিসাব সবকিছুই সামলাচ্ছেন পুরোদমে।
"মানুষের কথায় কান দিলে জীবন থমকে যাবে। লজ্জা ভেঙে আবার ধরলেন সাইকেলের হ্যান্ডেল।"
📊 তথ্যের সারসংক্ষেপ
- 📍 স্থান: ঠাকুরগাঁও পীরগঞ্জ রেলস্টেশন, হরিপুর উপজেলা মাগুরা গ্রাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুর
- 👥 খবরের মুখ্য ব্যক্তি: মো. সোহরাব হোসেন সুজন (স্টেশনমাস্টার), নাসিমা (বোন), হাবিব (দুলাভাই)
- 🔢 গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা: ২০০৩ (দুর্ঘটনা), ২০০৮ (জিপিএ ৪.৬০), ২০১০ (জিপিএ ৪.৯০), ২০১৯ (এএসএম পদে যোগদান), ২০২৩ (স্টেশনমাস্টার পদোন্নতি), ৫৫-৬০ (সেলফ-স্টাডি গ্রুপের সদস্য)
💬 মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!