📌 খলিফা ওমর ইবনুল খাত্তাবের আমলে সংঘটিত কাদিসিয়া ও নাহাওয়ান্দ যুদ্ধে পারস্যের সাসানীয় সাম্রাজ্য পতনের পথে প্রবেশ করে। মুসলিম সেনাপতি সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাসের নেতৃত্বে পারস্যের বিশাল বাহিনীকে পরাজিত করে মুসলমানরা মেসোপটেমিয়া ও ইরানের অধিকাংশ অঞ্চল দখল করে নেয়। ইতিহাসের এই যুদ্ধে পারস্যের প্রধান সেনাপতি রুস্তম নিহত হন এবং ৩০ হাজার সৈন্য মারা যায়
খলিফা ওমর ইবনুল খাত্তাবের আমলে সংঘটিত দুটি ঐতিহাসিক যুদ্ধ পারস্যের সাসানীয় সাম্রাজ্যের পতনের পথে চিরতরে পরিবর্তন আনেছিল। প্রথমটি ছিল ইরাকের কাদিসিয়া প্রান্তরে সংঘটিত ‘কাদিসিয়ার যুদ্ধ’ এবং দ্বিতীয়টি ছিল ইরানের পাহাড়ি অঞ্চলে ‘নাহাওয়ান্দ যুদ্ধ’। এই দুটি যুদ্ধের মাধ্যমে মুসলিমরা মেসোপটেমিয়া ও ইরানের বিশাল অঞ্চল দখল করে নেয় এবং পারস্যের সামরিক ও রাজনৈতিক প্রভাবকে চিরতরে ভাঙতে সক্ষম হয়।
🔴 মূল পয়েন্ট
- 📌 খলিফা ওমর ইবনুল খাত্তাবের নেতৃত্বে মুসলিম সেনাপতি সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস পারস্যের প্রধান সেনাপতি রুস্তমকে কাদিসিয়া যুদ্ধে হত্যা করে পারস্যের বিশাল বাহিনীকে পরাজিত করেন।
- 📌 যুদ্ধের আগে পারস্যের রাজকীয় তাঁবুতে প্রবেশকারী সাহাবি রিবয়ি ইবনে আমির পারস্যের সম্রাট তৃতীয় ইয়াজদেগার্দকে বলেছিলেন, ‘আল্লাহই আমাদের পাঠিয়েছেন মানুষকে মানুষের দাসত্ব থেকে বের করে এক আল্লাহর দাসত্বে ফিরিয়ে আনতে’।
- 📌 কাদিসিয়া যুদ্ধে পারস্যের ৩০ হাজার সৈন্য নিহত হয়, অন্যদিকে মুসলিমদের মধ্যে সাড়ে আট হাজার যোদ্ধা শাহাদাতবরণ করেন।
- 📌 পারস্যের সম্রাট তৃতীয় ইয়াজদেগার্দ রাজধানী ছেড়ে পালিয়ে যান এবং মুসলিমরা মাদায়েন (বর্তমান ইরাকের তিসফুন) দখল করে নেয়।
- 📌 এই যুদ্ধের মাধ্যমে পারস্যের সাসানীয় সাম্রাজ্যের প্রাণকেন্দ্র ও রাজনৈতিক রাজধানী মাদায়েনের পথ পুরোপুরি উন্মুক্ত হয়।
📰 বিস্তারিত
সুপ্রাচীনকাল থেকে বিশ্বরাজনীতিতে শাসন করে আসছিলো দুটি মহাশক্তি—রোমান বাইজেন্টাইন ও পারস্যের সাসানীয় সাম্রাজ্য। এর মধ্যে সাসানীয় সাম্রাজ্য আধুনিক ইরান, ইরাক ও মধ্য এশিয়ার বিশাল অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত ছিল। এই সাম্রাজ্যের পতন ছিল এক দীর্ঘ সামরিক ও মনস্তাত্ত্বিক অভিযানের পরিণতি। খলিফা ওমর ইবনুল খাত্তাবের আমলে সংঘটিত কাদিসিয়া ও নাহাওয়ান্দ যুদ্ধ ইতিহাসের গতিপথ চিরতরে বদলে দেয়।
খলিফা আবু বকর (রা.)-এর আমলে শুরু হওয়া ইরাক অভিযানের ধারাবাহিকতায় মুসলিমরা মেসোপটেমিয়ার উর্বর সমভূমিতে একের পর এক বিজয় অর্জন করতে শুরু করেন। পারস্যের রাজদরবার বুঝতে পেরেছিল যে এটি কোনো সাধারণ সীমান্ত সংঘর্ষ নয়। পারস্যের তরুণ সম্রাট তৃতীয় ইয়াজদেগার্দ সাসানীয় সাম্রাজ্যের সবচেয়ে প্রবীণ ও ঝানু সেনাপতি রুস্তমের নেতৃত্বে প্রায় এক লাখ বিশ হাজার সৈন্যের বিশাল বাহিনী ময়দানে নামান।
পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে খলিফা ওমর (রা.) সেনাপতির দায়িত্ব অর্পণ করেন নবীজির মামা ও বিশিষ্ট সাহাবি সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাসকে। হিজরি ১৬ সনে ইরাকের কাদিসিয়া নামক স্থানে উভয় বাহিনী মুখোমুখি হয়। যুদ্ধের আগে মুসলিমদের পক্ষ থেকে প্রতিনিধি পাঠিয়ে পারস্য সেনাপতির সঙ্গে শান্তি আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সেই আলোচনার অংশ হিসেবে সাধারণ পোশাকে সজ্জিত সাহাবি রিবয়ি ইবনে আমির পারস্যের রাজকীয় তাঁবুতে প্রবেশ করেন।
রুস্তম যখন আরবের মতো এক অনগ্রসর জাতির অভিযানের কারণ জানতে চাইলেন, তখন রিবয়ি বিন আমির অত্যন্ত দৃঢ়কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘আল্লাহই আমাদের পাঠিয়েছেন মানুষকে মানুষের দাসত্ব থেকে বের করে এক আল্লাহর দাসত্বে ফিরিয়ে আনতে, দুনিয়ার সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত করে পরকালের প্রশস্ততার দিকে আহ্বান জানাতে এবং প্রচলিত ধর্মগুলোর শোষণ ও অবিচার থেকে ইসলামের ন্যায়বিচারের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় দিতে’।
"আল্লাহই আমাদের পাঠিয়েছেন মানুষকে মানুষের দাসত্ব থেকে বের করে এক আল্লাহর দাসত্বে ফিরিয়ে আনতে, দুনিয়ার সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত করে পরকালের প্রশস্ততার দিকে আহ্বান জানাতে এবং প্রচলিত ধর্মগুলোর শোষণ ও অবিচার থেকে ইসলামের ন্যায়বিচারের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় দিতে।"
পারস্যের রাজদরবার ‘লাইলাতুল হারির’ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে অস্ত্রের ভাষায় কথা বলতে চাইল। ফলে শুরু হলো রক্তক্ষয়ী কাদিসিয়া যুদ্ধ। যুদ্ধের প্রাথমিক দিনগুলোতে পারস্যের প্রশিক্ষিত হাতির বহর মুসলিম ঘোড়াগুলো আতঙ্কিত করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু মুসলিমরা দ্রুত রণকৌশল পাল্টে ফেলেন; তাঁরা বল্লম ও তির দিয়ে হাতির চোখ ও শুঁড়কে লক্ষ্যবস্তু বানান। এতে আহত হাতিগুলো ক্ষিপ্ত হয়ে পেছন ফিরে নিজেদের পারস্য সৈন্যদেরই পদতলে পিষ্ট করতে শুরু করে। টানা চার দিনব্যাপী এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের শেষ রাতটি ইতিহাসে ‘লাইলাতুল হারির’ বা ক্রন্দনের রাত হিসেবে পরিচিত। সেই রাতে অন্ধকারে ঢাল ও তরবারির ঝনঝনানি আর যোদ্ধাদের চিৎকার ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছিল না।
ভোরের আলো ফুটতেই সেনাপতি রুস্তম মুসলিম সেনাদের হাতে নিহত হন। প্রধান সেনাপতির মৃত্যুতে পারস্য বাহিনীতে চরম বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে এবং তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। ৩০ হাজারের বেশি পারসিক সৈন্য নিহত হয়। অন্যদিকে সাড়ে আট হাজার মুসলিম যোদ্ধা শাহাদাতবরণ করেন। এই যুদ্ধ ছিল প্রাথমিক যুগের ইসলামি ইতিহাসে মুসলিমদের পক্ষে সর্বোচ্চ প্রাণহানির ঘটনা। পারস্যের সম্রাট তৃতীয় ইয়াজদেগার্দ রাজধানী ছেড়ে পালিয়ে যান এবং মুসলিমরা মাদায়েন (বর্তমান ইরাকের তিসফুন) দখল করে নেয়।
📊 তথ্যের সারসংক্ষেপ
- 📍 স্থান: কাদিসিয়া (ইরাক), মাদায়েন (বর্তমান ইরাকের তিসফুন), নাহাওয়ান্দ (ইরানের পাহাড়ি অঞ্চল)
- 👥 খবরের মুখ্য ব্যক্তি: খলিফা ওমর ইবনুল খাত্তাব, সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস, রিবয়ি ইবনে আমির, রুস্তম, তৃতীয় ইয়াজদেগার্দ
- 🔢 গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা: ১৬ হিজরি, ৩০ হাজার পারসিক সৈন্য নিহত, সাড়ে আট হাজার মুসলিম শাহাদাতবরণ
💬 মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!