📌 ১৯২১ সালে সিলেটের চা-বাগানের শ্রমিকরা ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে 'মুল্লুকে চলো' আন্দোলন শুরু করে। ৩০ হাজার শ্রমিকের বিশাল যাত্রা চাঁদপুরে রক্তাক্ত সংঘর্ষে শেষ হয়। ঔপনিবেশিক শোষণ ও অধিকার আদায়ের দাবিতে এই আন্দোলন শুরু হয়
১৯২১ সালের মে মাসে সিলেটের চা-বাগানের শ্রমিকরা ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে একটি ঐতিহাসিক আন্দোলন শুরু করে। 'মুল্লুকে চলো' নামে পরিচিত এই আন্দোলনে ৩০ হাজার শ্রমিকের বিশাল যাত্রা শুরু হয়, যারা নিজেদের পূর্বপুরুষের জন্মভূমিতে ফিরে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে। এই আন্দোলন শুরু হয় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শোষণ ও শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের দাবিতে।
🔴 মূল পয়েন্ট
- 📌 ১৯২১ সালের ১ ও ২ মে কাছাড়ের রাতারবাড়ী বাজারে সভায় 'মুল্লুকে চলো' আন্দোলনের সূচনা হয়, যার অর্থ 'আমাদের মাটিতে যাওয়া'।
- 📌 আনিপুর চা-বাগানের ৭৫০ জন শ্রমিক প্রথমে বাগান ছেড়ে চাঁদপুরের দিকে যাত্রা শুরু করে, পরে ৩০ হাজার শ্রমিকের বিশাল যাত্রা শুরু হয়।
- 📌 ব্রিটিশ প্রশাসন ও চা-বাগান মালিকদের বাধায় ২০ মে চাঁদপুরে প্রায় ৩ হাজার শ্রমিক আটকা পড়ে এবং রক্তাক্ত সংঘর্ষে পড়ে।
- 📌 চা-বাগান শ্রমিকদের মধ্যে ১৮৫৪ সাল থেকে শুরু হওয়া ঔপনিবেশিক শ্রমব্যবস্থা ও কঠোর নিয়ন্ত্রণ ছিল।
- 📌 'টি টোকেন' নামক একটি ব্যবস্থায় শ্রমিকদের বাগানের সীমানার মধ্যে বন্দী রাখা হতো।
📰 বিস্তারিত
সিলেটের সবুজ চা-বাগান বাংলাদেশের অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র, কিন্তু এই সবুজের আড়ালে রয়েছে ঔপনিবেশিক শোষণ ও শ্রমিকদের দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। উনিশ শতকের মাঝামাঝি বাণিজ্যিক চা চাষের সূচনা থেকে ১৯২১ সালের 'মুল্লুকে চলো' আন্দোলন পর্যন্ত প্রায় সাত দশকে সিলেটের চা-বাগানগুলো শুধু অর্থনৈতিক শিল্পে পরিণত হয়নি, এখানে গড়ে উঠেছিল একটি স্বতন্ত্র শ্রমিক সমাজ। মালনীছড়া চা-বাগান ১৮৫৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৮৫৭ সালে সেখানে বাণিজ্যিকভাবে চা উৎপাদন শুরু হয়। এটি পূর্ববঙ্গের বাণিজ্যিক চা-শিল্পের অন্যতম প্রাথমিক কেন্দ্র ছিল।
চা-বাগান বাড়তে থাকলেও শ্রমিক সংকট দেখা দেয়। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বড় অংশকে দীর্ঘ সময়ের চা চাষের কাজে নিয়োগ করা কঠিন হওয়ায় ব্রিটিশ বাগানমালিকেরা ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শ্রমিক সংগ্রহ করতে শুরু করেন। ছোটনাগপুর, বিহার, ওডিশা, মধ্যপ্রদেশ ও বর্তমান অন্ধ্র প্রদেশ অঞ্চলের বিভিন্ন প্রান্তিক জনগোষ্ঠী থেকে শ্রমিক নিয়োগ করা হতো। শ্রমিকদের মধ্যে মুন্ডা, সাঁওতাল, ওঁরাও, হো, গন্ডসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মানুষ ছিলেন। শ্রমিকদের জীবন ছিল কঠিন এবং তাদের কাজ, বাসস্থান ও দৈনন্দিন জীবন অনেকাংশে বাগান কর্তৃপক্ষের ওপর নির্ভরশীল ছিল।
১৯২০ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অসহযোগ আন্দোলনের প্রভাব আসামের চা-বাগান অঞ্চলেও পৌঁছায়। ১৯২১ সালের মে মাসের শুরুতে কাছাড় অঞ্চলে সভা হয় এবং শ্রমিকদের মধ্যে নিজেদের 'মুল্লুক'-এ ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা আরও সংগঠিত হয়ে ওঠে। ১ ও ২ মে কাছাড়ের রাতারবাড়ী বাজারে সভার পর আন্দোলন তীব্র হয়। ৩ মে আনিপুর চা-বাগানের প্রায় ৭৫০ শ্রমিক স্ত্রী-সন্তানসহ বাগান ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন। পরে বিভিন্ন চা-বাগানের শ্রমিক তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন। তাঁদের লক্ষ্য ছিল পূর্বপুরুষের ভূমিতে ফিরে যাওয়া। এই প্রত্যাবর্তনের ডাকই শ্রমিকদের ভাষায় পরিচিত হয় 'মুল্লুকে চলো' নামে।
আন্দোলন দ্রুত বড় আকার ধারণ করে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, চরগোলা ও লঙ্গাই উপত্যকা থেকে ৮ হাজার ৭৯৯ জন শ্রমিক বেরিয়ে এসেছিলেন। তবে বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদন ও ঐতিহাসিক বর্ণনায় বৃহত্তর সিলেটের কাছাড় অঞ্চল থেকে আন্দোলনে অংশ নেওয়া শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৩০ হাজার বলে উল্লেখ করা হয়েছে। শ্রমিকদের প্রধান গন্তব্য হয়ে ওঠে চাঁদপুর। তাঁদের পরিকল্পনা ছিল, সেখান থেকে স্টিমারে নদীপথে এবং পরে রেলপথে নিজেদের পূর্বপুরুষের এলাকায় ফিরে যাওয়া। কিন্তু ব্রিটিশ প্রশাসন ও চা-বাগান মালিকদের বাধায় ২০ মে চাঁদপুরে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক আটকা পড়ে। দমন-পীড়নের ফলে এই আন্দোলন রক্তাক্ত সংঘর্ষে পরিণত হয়।
"মুল্লুকে চলো"
📊 তথ্যের সারসংক্ষেপ
- 📍 স্থান: সিলেট, কাছাড়, চাঁদপুর, মালনীছড়া, চরগোলা, লঙ্গাই উপত্যকা
- 👥 খবরের মুখ্য ব্যক্তি: চা-বাগানের শ্রমিকরা (মুন্ডা, সাঁওতাল, ওঁরাও, হো, গন্ড)
- 🔢 গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা: ৩০ হাজার শ্রমিক, ৭৫০ শ্রমিক (আনিপুর বাগান), ৮ হাজার ৭৯৯ জন (চরগোলা ও লঙ্গাই), ৩ হাজার শ্রমিক (চাঁদপুর)
💬 মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!